জামিলার ঘুম ভেঙে গেল মোরগের ডাকে। তবে এটা ভোরের পবিত্র আজান দেওয়া ডাক নয়। এটা ছিল একটা কর্কশ, হিংস্র চিৎকার, যা ধুলোমাখা দুপুরটাকে চিরে দিচ্ছিল। বিছানার এক পাশে জাভেদ অকাতরে ঘুমাচ্ছে।
তার ভাঙা পা-টা অদ্ভুতভাবে ভাঁজ করা, যেন একটা ছেঁড়া ডাল। জামিলা নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরটা ছোট, ভ্যাপসা গরমে দমবন্ধ হয়ে আসে। একমাত্র জানালাটা উঠোনের দিকে খোলা।
সেই জানালার শিক ধরে জামিলা বাইরে তাকাল। উঠোনের মাঝখানে দৃশ্যটা জমাট বেঁধে আছে। একটা বিশাল লাল ঝুঁটির মোরগ, উদ্ধত রাজার মতো, একটা তরুণী ছাইরঙা মুরগির ঘাড় চেপে ধরেছে।
মুরগিটা ডানা ঝাপটাচ্ছে, কঁক কঁক করে একটা অসহায় আর্তনাদ তার গলা দিয়ে বের হচ্ছে, কিন্তু লাল রাজার পেশির শক্তির কাছে সব বৃথা।
দৃশ্যটা দেখে জামিলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে পড়ল কামালের কথা। তার প্রথম স্বামী। কামাল ছিল ওই লাল মোরগটার মতোই।
সম্ভ্রান্ত, সুদর্শন, সমাজের চোখে একজন সফল পুরুষ। কিন্তু বন্ধ দরজার আড়ালে সে ছিল একচ্ছত্র রাজা।
তার ভালোবাসা ছিল অধিকার, তার আদর ছিল দখলদারিত্ব। জামিলার শরীরটা ছিল তার সাম্রাজ্য, যেখানে সে নিজের ইচ্ছেমতো বিজয় নিশান পুঁতত। জামিলা ছিল তার খাঁচায় পোষা ময়না, যার সৌন্দর্য শুধু তারই ভোগের জন্য।
হঠাৎ একটা কালবৈশাখীর মতো উঠোনে ছুটে এল আরেকটা মোরগ। কালো কুচকুচে তার গায়ের রঙ, আর একটা পা ভাঙা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে সে ছোঁ মেরে মুরগিটাকে লাল রাজার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। এক মুহূর্তের জন্য জামিলার মনে হলো, যাক, মুক্তি মিলল! মুরগিটা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘাড় উঁচু করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।
কিন্তু উঠোনটা কোনো রূপকথার রাজ্য নয়।
পরের দৃশ্যটা ঘটল আরও দ্রুত, আরও পাশবিকভাবে। কালো ল্যাংড়া মোরগটা মুরগিটাকে উদ্ধার করেনি, সে নিজের শিকার নিশ্চিত করেছে মাত্র।
আগেরটার চেয়েও হিংস্রভাবে সে মুরগিটার টুঁটি চেপে ধরল। তার ভাঙা পা দিয়ে মাটিকে আঁকড়ে ধরে সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে মুরগিটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার মধ্যে কোনো আভিজাত্য ছিল না, ছিল শুধু আদিম ক্ষুধা আর প্রমাণ করার জেদ।
সে যেন চিৎকার করে বলছিল, ‘আমি ল্যাংড়া হতে পারি, কিন্তু আমিই রাজা!’
জামিলার শরীরটা কেঁপে উঠল। এই তো জাভেদ। কামাল নামক খাঁচা থেকে যে তাকে উদ্ধার করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। জাভেদ এসেছিল এক ঝলক মুক্তির বাতাসের মতো। বলেছিল, “তোমাকে আমি এই জেলখানা থেকে বের করে আনব, জামিলা। আমার সাথে চলো, আমরা নতুন করে বাঁচব।
জামিলা চলে এসেছিল। কিন্তু জেলখানা বদলানো মানেই মুক্তি নয়। জাভেদের ভালোবাসা ছিল আরও ভয়ংকর।
তার শারীরিক খামতি, তার ভেতরের হীনম্মন্যতা তাকে এক হিংস্র পশুতে পরিণত করেছিল। প্রতি রাতে জামিলার নিঃসহায় দেহটিকে হিংস্রতার উন্মাদনায় বিদীর্ণ করত সে—শুধু নিজের পৌরুষের বিকারগ্রস্ত অহংকারটাকে তৃপ্ত করতে। তার কাছে জামিলার শরীরটা ছিল তার একমাত্র রাজত্ব, তার একমাত্র বিজয়। কামালের ধর্ষণ ছিল পরিপাটি, গোছানো; জাভেদেরটা ছিল কাঁচা, রক্তাক্ত।
উঠোনে কাজ শেষ করে কালো মোরগটা একটা গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। তারপর ঘাড় উঁচু করে তার ভাঙা গলায় বিজয়ের চিৎকার দিল— কোঁক… কোঁক… কো…।
আহত, বিধ্বস্ত মুরগিটা কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে টলতে টলতে কয়েক পা এগোল। তার ছাইরঙা পালকগুলো ধুলোয়, রক্তে মাখামাখি। সে যেন আর মুরগি নেই, একটা ধুলোর দলা। টলতে টলতে সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে জামিলার জানালার দিকে তাকাল।
তার নিষ্প্রভ, বেদনায় ভরা চোখ দুটো যেন সরাসরি জামিলার চোখের গভীরে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো ভাষা ছিল না, ছিল শুধু একটা নীরব প্রশ্ন। একটা বোবা বোঝাপড়া।
‘কে সুখী, তুমি না আমি?’
জামিলা শিকের ওপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে দিল। তার রাতজাগা চোখের নিচে জমে থাকা কালিটা যেন আরও গভীর হলো। সে ফিসফিস করে নিজেকেই বলল, আমরা দুজনেই ধুলোর ময়না।
ওরা ধর্ষণ করে যায়। রাজার বেশে। কেউ সম্ভ্রান্ত প্রাসাদে, কেউ ভাঙা কুটিরে। কেউ ক্ষমতার অহংকারে, কেউ হীনম্মন্যতার আক্রোশে।
রাজারা বদলায়। ধর্ষণের ভূগোল বদলায় না।



