মহানন্দার তীরে

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা......

বাথান – সুমন নাসির

চৈত্রের শেষ দিক। বরেন্দ্রের লাল মাটি যেন আগুন ছড়াচ্ছে। চোখ যতদূর যায়, শুধু ধূ ধূ করা মাঠ। তবু এই রুক্ষতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য। মাঝে মাঝে একা দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ। তার পাশ দিয়ে সোনালি ধানের খেত। অন্যরকম লাগে। এই ধানই টেনে আনে দূর-দূরান্তের মানুষজনকে। পদ্মার চর থেকে শত শত ভূমিহীন কৃষক এই সময়ে ছুটে আসে ধান কাটতে। মাঠে,র কিনারে বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে টানা ছোট ছোট ঘর তৈরি করে। স্থানীয়রা বলে—বাথান।

রফিকও তাদেরই একজন। শিবগঞ্জ উপজেলার দিয়াড়  অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। প্রতি বছর এই একই সময়ে চলে আসে। পেশীবহুল গড়ন, রোদে পোড়া তামাটে চামড়া, চোখে ধারালো দৃষ্টি—অন্যদের থেকে আলাদা। কথা খুব কম বলে। কিন্তু কাজে? তার জুড়ি মেলা ভার। কাস্তে চালাতে গেলে যেন হাত দুটো নিজে নিজে কথা বলে। সন্ধ্যা নামলে বাকিরা আড্ডা দেয়, গান গায়। রফিক এক কোণে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের সামনে ভাসে গ্রামে রেখে আসা বিধবা মা আর ছোট বোনের মুখ।

এই বাথানটা পড়েছে হাশেম মণ্ডলের জমির পাশে। মণ্ডল এলাকার বেশ বড় গৃহস্থ। বিঘার পর বিঘা জমি। তার একমাত্র মেয়ে চম্পা। সদ্য যৌবনে পা রেখেছে। রুক্ষ বরেন্দ্রের মাটিতে যেন একটা বুনো ফুল ফুটে আছে। চোখে-মুখে কৌতূহল, আর একটা চাপা উচ্ছ্বাস। শহরের কলেজে পড়ে। ছুটিতে বাড়ি এসেছে। তার কাছে এই বাথানের জীবনটা রহস্যের মতো।

প্রথম দিন এসেছিল কামলাদের জন্য জল দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। সেখানেই রফিকের সঙ্গে চোখাচোখি। রফিকের গভীর, শান্ত চোখ দেখে কী যেন একটা অচেনা ঝড় উঠেছিল বুকে। রফিকও থমকে গিয়েছিল। ধুলো-ঘাম মাখা শরীরের মাঝে চম্পার মুখটা যেন কাঁটা হয়ে বিঁধেছিল।

তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে চম্পা মাঠের ধারে চলে আসত। কখনো বাছুরের জন্য ঘাস কাটতে, কখনো শুধু হাঁটতে। কথা হতো খুবই কম। কিন্তু চোখে চোখে যে ভাষা চলত—সেটা ছিল পুরো একটা মহাকাব্য। রফিক কাজ করতে করতে আড়চোখে দেখত—খেতের আইলে দাঁড়িয়ে চম্পা। চম্পাও দেখত—কীভাবে রফিকের কাস্তে একটানা সোনা ঝরিয়ে দিচ্ছে মাটি থেকে।

এক ভরদুপুর। সবাই গাছতলায় জিরোচ্ছে। চম্পা হঠাৎ এক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে এসে দাঁড়াল রফিকের সামনে।  

“অনেক খাটোনি যাইছে, না?” ভাঙা গলায় বলল।  

রফিক ঘাম মুছতে মুছতে গ্লাসটা নিল। এক ঢোকে শেষ করে বলল,  

“পেটের দায়ে খাটোনি গায়ে লাগে না, জ্বি ……।”  

“হাঁর নাম চম্পা।”  

“হাঁমি রফিক।”

সেখান থেকেই শুরু। কথা বলার সুযোগ বাড়তে লাগল। সন্ধ্যা নামলে বাথানে কেরোসিনের কুপি জ্বলত। চম্পা লুকিয়ে বাড়ির পেছনের আমবাগানে চলে আসত। রফিকও কাজ শেষ করে সবার চোখ এড়িয়ে যেত। অন্ধকারে পাশাপাশি বসত। রফিক বলত গ্রামের কথা—নদীর ভাঙন, অভাব, ছোট ছোট স্বপ্ন। চম্পা বলত শহরের জীবন, তার ভালো না লাগার কথা। এই বিশাল প্রান্তরে সে নিজেকে খুব একা বোধ করত।

তাদের এই গোপন মেলামেশা বাথানের বয়স্ক কামলা আমজাদ চাচার চোখ এড়ায়নি। একদিন রফিককে ডেকে বললেন,  

“রফিক, যা করছিস, ভালো করছিস ন্যা। মণ্ডল বাড়ির বেটি—আকাশে থাকে। হাঁরা মাটির মানুষ। এই প্রেম তোর লাইগ্যা বিপদ ডাইক্যা আনবে।”  

রফিক শুধু ম্লান হেসেছিল। প্রেম তো জাত-পাত-শ্রেণি মানে না। কাকে বোঝাবে সে কথা?

সম্পর্কটা গভীর হতে বেশি সময় লাগেনি। এক পূর্ণিমার রাত। গোটা মাঠ চাঁদের আলোয় ভাসছে। আমবাগানের সবচেয়ে নির্জন কোণে তারা মিলিত হলো। চারদিকে ঝিঁঝিঁর ডাক। ধানের শিষের ওপর দিয়ে বাতাসের শোঁ শোঁ। সেই রাতে কোনো বাধা মানেনি। রফিকের খসখসে, শক্ত হাতের ছোঁয়ায় চম্পার শরীর কেঁপে উঠছিল। তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা।

কিন্তু গোপন অভিসার গ্রামের বখাটে মোকসেদের চোখ এড়ায়নি। মোকসেদ হাশেম মণ্ডলের জ্ঞাতি ভাইপো। চম্পার ওপর তার অনেকদিনের নজর। সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একদিন সব খুলে বলে দিল মণ্ডলকে।

বাড়িতে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। হাশেম মণ্ডল গর্জে উঠলেন। চম্পার বাইরে বেরোনো বন্ধ। প্রচণ্ড মারধর। শেষে সিদ্ধান্ত—ধান কাটা শেষ হলেই মোকসেদের সঙ্গে বিয়ে।

রফিক কিছুই জানে না। দুদিন চম্পাকে না দেখে ছটফট করছে। মন বলছে—কিছু একটা হয়েছে। ধান কাটা প্রায় শেষ। আর মাত্র দু-দিন। তারপর বাথান গুটিয়ে সবাই ফিরবে। বুক ফেটে যাচ্ছিল তার। চম্পাকে ছাড়া বাঁচবে কী করে?

শেষ রাতের আগের দিন। রফিক মরিয়া। চম্পার এক সখীর হাত দিয়ে চিঠি পাঠাল। লিখল—  

“কাইল রাইতে পাইঠের টাকা লিয়্যা বাড়ির কান্টার শিমুল গাছতলায় অপেক্ষা করব। তুমি যদি আসো, হাঁরা  ম্যালাই দূরে পাইল্ল্যা যাব। যেখানে কেহু খুঁইজ্যা পাইবে না খো।”

পরদিন রাত। মজুরি হাতে পেল রফিক। টাকাগুলো গামছায় বেঁধে কোমরে গুঁজল। বাথানের সবাই ঘুমের আয়োজন করছে। রফিক নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। চারদিক ঘুটঘুটে। শুধু আকাশে কয়েকটা তারা টিমটিম করছে।

বাড়ির ভেতর চম্পাও ছটফট করছে। চিঠি পেয়েছে। পালানোর সব প্রস্তুতি শেষ। সবাই ঘুমালে পা টিপে টিপে বের হলো।

শিমুল গাছতলায় আবছা অন্ধকারে রফিক দাঁড়িয়ে। হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ। চম্পা এসেছে ভেবে ঘুরতেই—সামনে মোকসেদ আর তার তিন সঙ্গী। হাতে লাঠি, ধারালো ফলা।  

মোকসেদ হিংস্র হেসে বলল,  

“কিরে কামলার ব্যাটা, মণ্ডল বাড়ির ফুল লিয়্যা ভাগবি? শখ কত তোর!”  

রফিক বুঝল—শেষ সময়। তবু হার মানার পাত্র নয়। গর্জে উঠল,  

“চম্পা হাঁকে ভালোবাসে। তোর মতো জানোয়ারকে লয়?”

কথা শেষ হতেই মোকসেদের লাঠি সপাটে মাথায়। রফিক টাল সামলে একজনকে লাথি মেরে ফেলল। কিন্তু একা চারজনের সঙ্গে কতক্ষণ? হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সবাই। লাঠির আঘাতে মাথা ফেটে গেল। ফলার চোটে বুক চিরে রক্ত ঝরতে লাগল। শুকনো লাল মাটি ভিজে উঠল।

ঠিক তখনই চম্পা এসে পৌঁছাল। দেখল—রফিক রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে। মোকসেদরা ঘিরে উল্লাস করছে। গলা চিরে বেরিয়ে এল চিৎকার—  

“রফি…ক!”

চিৎকার শুনে মোকসেদরা চমকে উঠল। চম্পাকে দেখে এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

চম্পা ছুটে গিয়ে রফিকের মাথা কোলে তুলল। রফিকের ঠোঁট কাঁপছে। চোখ ঝাপসা। ফিসফিস করে বলল,  

“চম্পা… তোমাকে, হাঁমি… অনেক…”  

কথা শেষ করতে পারল না। মাথাটা কোলের ওপরই ঢলে পড়ল।

পরদিন সকাল। বাথানে নেমে এল শীতল নিস্তব্ধতা। রফিকের নিথর দেহ শিমুল গাছতলায়। পুলিশ এল। লাশ নিয়ে গেল। হাশেম মণ্ডল মোকসেদকে বাঁচাতে সব ব্যবস্থা করলেন। প্রচার হলো—টাকা নিয়ে কামলাদের মধ্যে মারামারিতে রফিক মরেছে। বাকিরা ভয়ে চুপ। সেদিনই সব গুটিয়ে গ্রামে ফিরে গেল। আমজাদ চাচা যাওয়ার আগে শুধু একবার ছলছল চোখে মণ্ডল বাড়ির দিকে তাকালেন।

ধান উঠে গেল। পড়ে রইল ন্যাড়া খেত আর রফিকের অপূর্ণ স্বপ্নের ছাই। চম্পা আর কথা বলেনি। জীবন্ত পাথর হয়ে গেল। মাসখানেক পর মোকসেদের সঙ্গেই বিয়ে। বিয়ের দিন লাল শাড়িতে এক নিষ্প্রাণ পুতুলের মতো বসে ছিল।

বছর ঘুরল। আবার চৈত্রের শেষ। মাঠে নতুন ধান দুলছে। নতুন কামলারা এসেছে। আবার বাথান গড়ে উঠেছে। জীবন চলছে তার নিয়মে।

শুধু মণ্ডল বাড়ির দোতলার জানালায় এক নারী সারাদিন বাইরে তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টি স্থির। শূন্য। হয়তো বাথানের দিকে তাকিয়ে রফিককে খোঁজে। বাতাস যখন শোঁ শোঁ করে বয়, মনে হয়—ওই বাতাসে মিশে আছে রফিকের শেষ না-বলা কথাগুলো। বাথান ভাঙে। বাথান গড়ে। কিন্তু কিছু প্রেম আর কিছু ট্র্যাজেডি এই লাল মাটিতে চিরকালের দাগ কেটে যায়।

Facebook
LinkedIn

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

“আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে… মহুয়া আমি নিজেই।”

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে……

কিন্তু জানো তো, সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর দাগ। জীবনটা সবসময় ফিল্টার লাগানো ছবির মতো হয় না।

মুখোশের আড়ালে – সুমন নাসির

শহরটা দেখতে বড় চকচকে, বাইরে থেকে মনে হয় যেন সবকিছু সোনায় মোড়া। সন্ধ্যাবেলায় কাঁচের দালানকোঠাগুলোতে রোদ পড়লে চোখ ধাঁধিয়ে যায়,

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top