মহানন্দার তীরে

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

"আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে... মহুয়া আমি নিজেই।"

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

সরকারি জরিপের কাজে আমাকে পাঠানো হয়েছিল পদ্মা নদীর চরে। পদ্মা-বর্ষায় হিংস্র জন্তু, শীতে শুকনো বালুর বিস্তার। আমি ইমরুল, শহরের ছেলে। চোখে স্কেল-কম্পাসের ঠান্ডা জ্যামিতি, হাতে নকশা আর ফাইল। এই কাদামাটি, কাশবন, এঁকেবেঁকে চলা নদী-সবই আমার কাছে সংখ্যা, দাগ, লাল-নীল লাইন।

চরে পৌঁছানোর তৃতীয় দিনে, বিকেলের দিকে, সব বদলে গেল। নদীর কিনারে সোনালি পলিমাটি। পানকৌড়ির ঝাঁক ডুবসাঁতার খেলছে। আর হাঁটু সমান জলে এক তরুণী- খয়েরি ছাপার শাড়ি, কোমরে আঁচল পেঁচানো। খালি হাতে জলের নিচে খুঁজছে, হঠাৎ রুপালি পুঁটিমাছ ধরে ফেলল। অবলীলায় মুখে পুরে চিবিয়ে গিলে ফেলল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে।সেই চোখ। পাকা মহুয়া ফুলের দানার মতো—যুগ যুগান্তরের চোলাই মদের নেশা মাখা। লজ্জা নেই, ভয় নেই, কৌতূহল নেই। শুধু আদিম, বুনো, নির্লিপ্ত ঔদাসীন্য। সেই এক ঝলকে আমার বুকের ভেতর পদ্মার ভাঙন শুরু হলো। কম্পাসের কাঁটা ঘুরতে ভুলল, স্কেলের সোজা দাগ বেঁকে গেল। আমি সেই মহুয়া-চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম, আর মনে হলো আমি কোনো নারীর চোখে নয়, বরং এক স্থির অচেনা আয়নায় নিজেরই অবদমিত, আদিম প্রতিবিম্ব দেখছি। সেই চোখের মণির গভীরে আমি দেখলাম আমারই মুখ, কিন্তু চোখ দুটো আর আমার নয়- তারা পাকা মহুয়ার দানা হয়ে গেছে, আমায় গিলছে।

গ্রামের লোক বলল, নাম মহুয়া। মান্তা সম্প্রদায়ের মেয়ে- যাযাবর, নৌকাই ঘর। নদীর খেয়ালে ভাসে, মাছ ধরে, সাপ ধরে, মহুয়া ফুলের রস দিয়ে মদ চোলাই করে বিক্রি করে। গ্রামের লোক এড়িয়ে চলে – ভয় আর ঘৃণায়। বলে, তার চোখে তাকালে ঘর-সংসার টেকে না।

আমার জরিপের কাজ গোল্লায় গেল। প্রতিদিন ভোরে পা নদীর দিকে চলে যেত। কাশবনে লুকিয়ে দেখতাম—ভেজা চুল পিঠে ঝাপটে দিলে কালো সাপের ফণা নাচে, ভাটিয়ালি গানে ঢেউ থমকে যায়। তার শরীর থেকে ভেসে আসত সোঁদা মাটি, কাঁচা মাছ, উগ্র মহুয়া ফুলের ঘ্রাণ। সেই গন্ধ শুধু নাকে নয়—চোখে লেগে যায়, সোনালি পলির মতো ঝরে পড়ে, আর আমি দেখি পদ্মার চরটা আমার রেটিনায় ফুটে উঠছে। কানে ভেসে আসে ভাটিয়ালি, কিন্তু গানের সুর নয়—আমার নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকধুক। মহুয়া ফুলের দানা যেন আমার শিরায় মিশে যাচ্ছে, রক্তের সঙ্গে চোলাই হয়ে বয়ে যাচ্ছে। রাতে ঘুম হতো না। শহরের সব আবরণ খসে পড়ছিল।

এক ভরদুপুরে নির্জন বাঁকে তাকে একা পেলাম। কচ্ছপের খোলে পলিমাটি আঁচড়াচ্ছে। আমি এগিয়ে গেলাম।“তোমার নাম মহুয়া?”সে মুখ না তুলে বলল, “নদীর মাইয়্যাগো নাম থাকে না, বাবু। আমগো নাম ঢেউ, আমগো নাম স্রোত, আমগো নাম ভাঙন।” আমি কাছে বসতে যাচ্ছিলাম। সে হিসহিস করে উঠল, “শহুরে মানুষের শরীরের সাবানের গন্ধে দম বন্ধ হয়। দূরে থাকো।”

কিন্তু আমার ভেতরের শিকারি জেগে উঠল। তাকে পেতে চাইলাম—এই বুনো সৌন্দর্যকে নিজের ছকে বাঁধতে চাইলাম।আমি উপহার নিয়ে যেতাম—চুড়ি, আলতা, ফিতে। সে হাসতে হাসতে নদীতে ছুঁড়ে ফেলত। “নদী এক ঘাটে বাঁধা থাকে না। আমাকেও বাঁধনের চেষ্টা কইরো না।”

তাঁবুতে রহিম সাহেব সাবধান করতেন, “মান্তাদের চোখে জাদু আছে। পড়লে আর উঠতে পারবেন না।” শত সাবধান বাণী শোনার পরেও আমি কিন্তু পড়ে গিয়েছিলাম।

অমাবস্যার গভীর রাত। ঘন মেঘ, জমাট অন্ধকার। আমি তাদের নৌকার কাছে গেলাম। কুপির হলদে আলোয় মহুয়া আর তার বাপ কালু মান্তা মদ খাচ্ছে। বাপটা দৈত্যের মতো, সাপের বিষ খাওয়া দাগ গায়ে। সে হাসল, “মাটির মাপ নিতে নিতে জলের মাপ নিতে আইছো?” মহুয়া ভাঁড় এগিয়ে দিল। “খাবা? এই মদ বুকের আগুন জ্বালায়। ভয়, লজ্জা সব ভাসায়।” 

ইতস্তবোধ করতে করতেও আমি গিলে ফেললাম সবটুকু। আগুন নেমে এল শরীরে। সব আবরণ পুড়ে গেল। আমি ও মহুয়া যন্ত্রণা নেভাতে কাদামাটিতে নেমে পড়লাম। সেটা প্রেম নয়—প্রকৃতির পাশবিক সংগম। খামচি, দাঁত, নখ, উন্মাদ উল্লাস। কাদামাটিতে শুয়ে আমরা মিশে যাই—তার শরীর থেকে পলি বেরিয়ে আমার শিরায় ঢোকে, আমার রক্ত থেকে মহুয়া ফুল ফোটে তার গায়ে। আমরা আর দুজন নই—একটা নদী হয়ে যাই, যার ঢেউ আমাদের হাড়ের ভিতর দিয়ে বয়ে যায়।

ভোরে হতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়, দেখি মহুয়া নেই। নৌকার বহর উধাও। শুধু নখের আঁচড় আর মহুয়া ফুলের ঘ্রাণ রয়ে গেল।

জরিপ শেষ করে শহরে ফিরলাম। রিপোর্ট জমা দিলাম, প্রমোশন পেলাম। কিন্তু প্রতি বর্ষায় সেই গন্ধ ফিরে আসে। ভেজা মাটি, মহুয়া ফুল। ঘুম ভাঙলে মনে হয় আমি হারিয়ে গেছি।

চার মাস পর এক মেসেজ এল। অপরিচিত নাম্বার—নাম্বারটি কার জানা নেই। শুধু লেখা, “মহুয়া তোমাকে খুঁজছে। পদ্মার চরে আসো।” মেসেজটি পড়তে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে শুকনো মহুয়া ফুলের সুভাষ ছড়িয়ে পড়ল। 

আমি রাতারাতি চলে গেলাম। চরে পৌঁছে দেখলাম সে আরও বুনো, চোখ আরও গভীর। হাসল সেই ধারালো হাসি।“আইছো? জানতাম আসবা।”

সেই রাতে আবার চোলাই মদ, আগুন, আবার কাদামাটি, আবার পাশবিক উল্লাস। ভোরে মহুয়া পাশে শুয়ে। চোখ খুলে বলল, “এবার যাইয়ো না। আমার পেটে তোমার বাচ্চা কিলবিল করতেছে। চার মাস হইছে।” তিন দিন চরে রইলাম। শেষ পর্যন্ত ফিরলাম না। আমার স্ত্রী রিয়া, ডাক্তার। মেসেজ পাঠালাম—আমি হারিয়ে গেছি, খুঁজো না। তারপর মহুয়ার নৌকায় উঠলাম। পকেট থেকে দামি মোবাইলটি ফেলে দিলাম, নদীতে। তারপর নদীতে ভাসি। মাছ ধরি, সাপ ধরি, চোলাই খাই। আমাদের ছেলে হয়, মহুয়া নাম রাখে পদ্মা। মহুকে বললাম পদ্মা তো মেয়েদের নাম, সে বলেছিল আমাদের ছেলেদের নাম হয় পদ্মা। মহুয়া তাকে কোলে নিয়ে গান গায়। আমি দূরে বসে দেখি আর ধোঁয়া উড়ায়।

রাতে জেগে উঠলে সেই গন্ধ আসে। আকাশে জ্যোৎস্না আসে। মাটিতে আগুন। ভেজা মাটি, কাঁচা মাছ, মহুয়া ফুল।

তারপর একদিন সকালে, নৌকার পাটাতনে বসে আমি দেখলাম—আমার হাতে কোনো আঁচড়ের দাগ নেই। কোনো দাঁতের ছাপ নেই। শরীরে সাবানের গন্ধ ফিরে এসেছে। আমি চমকে উঠলাম। চারদিকে তাকালাম। নৌকা নেই। মহুয়া নেই। ছেলে নেই। শুধু চরের বালু, আর দূরে একটা পরিত্যক্ত, পচা নৌকা—যার গায়ে লেখা “মহুয়া”।

আমি সাঁতরে গেলাম গ্রামে। রহিম সাহেব বললেন, “স্যার, আপনি তো চার মাস আগে চলে গেছেন। তারপর আর আসেননি। মান্তারা? ওরা কখনো এ চরে ফেরেনি, আপনি চলে যাওয়ার পর। কালু মান্তা মারা গেছে অনেক আগে। আর মহুয়া… সে তো সেই বাপ মরা রাতেই নদীতে ডুবে মরেছে, মান্তা সরদার ওরে ভোগ দখল করার প্রাক্কালে। গ্রামের লোক বলত, তার চোখে যে তাকায়, সে শুধু নদীর স্বপ্ন দেখে—আর স্বপ্ন থেকে ফিরতে পারে না।” 

আমি ফিরে এলাম শহরে। বাড়িতে। স্ত্রী জড়িয়ে ধরল। বলল, “কোথায় ছিলে এতদিন? চার মাস ধরে তোমাকে খুঁজছি।”আমি হাসলাম। বললাম, “কিছু না। একটা স্বপ্ন দেখছিলাম”

কিন্তু রাতে, যখন ঘুম আসে না, নাকে ভেসে আসে সেই গন্ধ। ভেজা মাটি। কাঁচা মাছ। মহুয়া ফুল। আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে।

আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে।

মহুয়া কখনো ছিল না।

না কোনো নৌকা, না কোনো বাপ, না কোনো বাচ্চা।

সেদিনের সেই পদ্মার জলে স্থির আয়নায় আমি যাকে দেখেছিলাম, সে ছিল আমারই মনের গভীরতম ভাঙন। শহরের নিয়ম-শৃঙ্খলার ভেতর চেপে রাখা সেই আদিম পুরুষ, যাকে আমি কখনো স্বীকার করিনি। জরিপের কাজে যখন প্রথমবার চরে পা রাখলাম, আমার নিজের ভেতরের সেই অন্ধকার অংশটা জেগে উঠল। আমি তাকে মহুয়া নাম দিলাম। তার চোখে—সেই মহুয়া-চোখ আয়নায়—আমি দেখলাম নিজের লুকিয়ে রাখা ক্ষুধা। তার গন্ধে পেলাম নিজের দম বন্ধ করা আদিমতা।

প্রথম রাতের সেই মিলন? সেটা ছিল আমার একার। কাদামাটিতে শুয়ে আমি নিজেকেই খামচে, কামড়ে, নিজেকেই জয় করেছিলাম। নখের দাগগুলো আমারই নিজের হাতের।

মেসেজ? সেটা আমি নিজেই লিখেছিলাম। আমার একটা গোপন সিম নাম্বার আছে, লুকানো একটা বাটন মোবাইল।

আর এখন? আমি বাড়িতে ফিরে এসেছি ঠিকই। স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরছি। চাকরি করছি। হাসছি।

কিন্তু প্রতি রাতে, যখন সে ঘুমিয়ে পড়ে, আমি জানালার কাছে দাঁড়াই। নাকে ভেসে আসে সেই গন্ধ।

আমি বুঝতে পারি—আমি কখনো ফিরিনি। যে ইমরুল ফিরেছে, সে শুধু একটা খোলস। আসল ইমরুল এখনও পদ্মার চরে কাদামাটিতে শুয়ে আছে। মহুয়ার চোখ দুটো তার বুকের ভেতর বসে আছে।

মাতাল।

অপেক্ষায়।

পরের বর্ষায় আবার ডাকবে। আর আমি জানি, এবার আর ফিরব না। কারণ মহুয়া আমি নিজেই। আর এই শহর, এই বাড়ি, এই স্ত্রী—সবই কি আরেকটা স্বপ্নের চর? নাকি আমি সবসময় পদ্মায় ভাসছি, আর শুধু ভাবছি ফিরেছি? রাতে ঘুম ভাঙলে দেখি—হাতে আবার নখের দাগ, গায়ে আবার দাঁতের ছাপ। স্ত্রী বলে, “কোথায় গিয়েছিলে?” আমি হাসি। কিন্তু জানি—আমি কখনো কোথাও যাইনি।

আমি সবসময় পদ্মার চরে। আর পরের বর্ষায় আবার মেসেজ আসবে। আমি নিজেকে লিখব। আবার।

Facebook
LinkedIn

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা……

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে……

কিন্তু জানো তো, সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর দাগ। জীবনটা সবসময় ফিল্টার লাগানো ছবির মতো হয় না।

মুখোশের আড়ালে – সুমন নাসির

শহরটা দেখতে বড় চকচকে, বাইরে থেকে মনে হয় যেন সবকিছু সোনায় মোড়া। সন্ধ্যাবেলায় কাঁচের দালানকোঠাগুলোতে রোদ পড়লে চোখ ধাঁধিয়ে যায়,

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top