চোখের হাসি; চোখও যে হাসতে পারে জানা ছিলো না আলামিনের। মেয়েটির চোখ ঠোঁটের মতো হাসছে; জলে ভেজা পানকৌড়ির মতো চোখের দুইটি তারা, যেনো ডানা ঝাঁপটিয়ে জলের ভেতর ডাকছে। কী সুন্দর চাহনি! চোখে চোখ পড়লেই বুকটা ধক করে ওঠে।
আলামিন ঢাকা শহরে নতুন এসেছে, বাহরাইন থেকে। সাত বছর আগে যদিও দুই তিনবার আসতে হয়ে ছিলো, বিদেশ যাওয়ার জন্য মেডিকেল ও ভিসা সংক্রান্ত কাজে। আট বছর আগে, তার মা অন্য পুরুষের সাথে পালিয়ে যায়। সেটা সহ্য করতে পারেনি তার বাবা। মানুষের হাসির পাত্র হয়ে, কিছুদিন বিষন্ন থাকতে-থাকতে বিষপান করে মারা যান। আলামিনের একটাই ছোটবোন লিজা, গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর ও লাজুক মেয়ে, ষোলো-সতেরো বছর বয়স। ভাই বোন নিজ বাড়িতে বসবাস করে কারো হাসির খোরাক হয়ে, কারো ফিসফিসানি হয়ে, কারো করুণা নিয়ে। বাড়ির বাইরে তারা তেমন একটা বের হয়না, তাদের মা যে ঘটনা ঘটিয়েছে- সেটা কল্পনাতীত। কিছুদিন পর তাদের মেজো ফুফুর বড়ো ছেলের সাথে লিজার বিয়ে হয়ে যায়। বাড়িতে একা হয়ে যায়- আলামিন।
আলামিন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কোনো দিন কাজ করেনি, বাপ মায়ের আদরের ছেলে। সংসারে হাজার টানাটানি থাকলেও কখনও ছেলে মেয়েদের অভাব বুঝতে দেয়নি, কোন আবদার অপূর্ণ রাখেনি। আর আজ কেউ নাই, শূন্য সংসার; মা পরের ঘরে বাবা মাটির গোরে। কাটছে দিন অর্ধাহারে-অনাহারে। ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে আলামিন।
এক পাড়া-প্রতিবেশি চাচা, বিদেশে লোক পাঠানোর দালাল হিসেবে গ্রামে বেশ নামডাক। সে পরামর্শ দিলো, আলামিন তুই বিদেশ চলে যা? বাড়িতে থাকলে না খেয়ে মারা যাবি, তোর যা অবস্থা দেখছি, কখন যে তোর বাপের মতো বিষ খাবি? তোর মা একটা হারামি, এই বুড়ো বয়সে কি একটা কাজ করলো! আলামিন কথা বলে না, চুপ করে থাকে। কিরে, কথা বলছিস না কেনো? যাবি বিদেশ? আলামিন বলে, টাকা কোথায় পাবো কাকা! খেতে পাইনা তোমরা কিছু না দিলে, আর এতো টাকা কোথায় পাবো আমি? দালাল চাচা বলে, তোর বাড়ি বিক্রি করে দে, বাপ-মা নাই, বিয়েও করিস নি, বোনটারও একটা ভালো ঘরে বিয়ে হয়ে গেছে, বাড়ি দিয়ে কি করবি? যদি পেটের ভাতের বন্দোবস্ত ই না থাকে? বিদেশ চলে যা ব্যাটা, অনেক টাকার মালিক হবি। তখন এসে একটা বাড়ি করবি, বিয়ে শাদি করবি?
আলামিনের দালাল চাচার কথা মনে ধরলো। সে বাপ হারানোর জন্য যতটাই না শোকে কাতর, তার চেয়ে বেশি লজ্জায়, অপমানে পাথর হয়ে আছে; মা তার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেছে। এটা সন্তানের জন্য কতটা কষ্টের সেই জানে, যার মা-বাবা এই জঘন্য পরকিয়া অপরাধ করে। সন্তানকে তাদের পাপের বোঝা বহন করতে হয়, সমাজের কাছে হতে হয় পদে পদে লজ্জিত। বাড়ির বাইরে তেমন একটা বের হয় না, আলামিন। যে গ্রামের মানুষগুলো তাকে আদর করতো, ভালোবাসতো! তারাই কিনা আজ তাকে দেখে কেমন করে তাকিয়ে থাকে, অন্যদের সাথে ফিসফিস করে কি যেনো বলে, তাকে দেখলে দূর থেকে পাশ কেটে চলে যায় বন্ধুরা। আলামিনের খুব কষ্ট লাগে, মরে যেতে ইচ্ছে করে। বাবার কথা মনে পড়ে, বাবা তুমি কোথায়? আমাকে নিয়ে যাও এই নরকের গ্রাম থেকে, তুমি কেনো একাই মরে গেলে? মরে গিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলে এই সমাজ থেকে? কেনো স্বার্থপরের মতো কাজ করলে? বাবা বলে, চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে আলামিন, তার কান্নার চিৎকারে কেঁপে ওঠে ইথার। উড়ে যায় কাক, কা কা করতে করতে মাথার ওপর।
আলামিনের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে, সে বিদেশেই চলে যাবে। ছোট বোন লিজাকে, বিদেশ চলে যাওয়ার কথা বলে, প্রথমে লিজা কিছুতেই রাজি হয়নি। বলে, ভাই তুমি বিদেশে থাকতে পারবা না, শুনেছি বিদেশ অনেক কষ্টের জায়গা, অনেক কষ্টের কাজ করতে হয়। তুমি তো কখনও কোনো কাজ ই করো নি? যতোই কষ্ট হোক রে বোন, আমাকে এই গ্রাম ছাড়তেই হবে। এই গ্রামের মানুষগুলো আমার গ্রামের প্রিয় আলো, বাতাস, নদী, বিল, মেঘ, পাখি, খেলার মাঠ বিষাক্ত করে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে আমার বাবাকে, আমার মা’কে করেছে পরকিয়া প্রেমের বলি। এগুলো বলে, ভাই-বোন অঝরে কাঁদতে থাকে, যে কান্না কাঁপিয়ে দেয় খোদার আরশ।
আমি বাঁচতে চাই বোন, আমাকে বাঁচাতে তুই সাহায্য কর? আমাকে বাড়িটা বিক্রি করার অনুমতি দে? লিজা একমাত্র ভাইয়ের করুণ অশ্রু ধৌত মুখ দেখে রাজি হয়ে যায়। যাও ভাই- কিন্তু লিজার হৃদয়টা আবার হু হু করে কেঁদে ওঠে; ভাই আমার আপন বলতে কেউ রইলো না রে? থাকবে না বাপের একমাত্র ভিটেমাটির স্মৃতিটুকুও।
লিজার এখন এক ছেলে এক মেয়ে, তারা এখন গাজীপুরে থাকে। লিজার স্বামী রায়হান একটি কোম্পানির ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার। সুখে-শান্তিতেই আছে, ফুফাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়ে। তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। এখানেই এসে উঠেছে আলামিন, গ্রামের বাড়ি যায়নি। সেখানে যাওয়ার নাই কোনো পিছুটান। শুধু বাবাকে মনে পড়ে, বাবার কবর জিয়ারত করার জন্য মনটা ছটপট করে ওঠে। পাঁচ দিন হলো বিদেশ থেকে আসা, এ পাঁচ দিনেই ভাগ্নে-ভাগ্নীর চোখের মনি হয়ে ওঠেছে আলামিন। তারা গাজীপুরের এক স্বনামধন্য কিন্ডারগার্টেন স্কুলে লেখাপড়া করে। আলামিন আসার পর থেকে, তার সাথে প্রতিদিন স্কুলে যায় ও আসে। ওদের স্কুলের ক্লাস চলে দুই ঘন্টা। ভাগ্নে-ভাগ্নীকে স্কুলে প্রবেশ করিয়ে, এই দুই ঘন্টা বাইরেই কাটায় আলামিন।
স্কুল থেকে তিন শত গজ দূরেই একটা হাফ বিল্ডিং বাড়ি, ফাঁকার ওপরে, আশেপাশে কোনো বাড়ি নাই। বাড়িটা খুবই ছোটো, চার থেকে পাঁচ রুমের হবে। বাড়ির সামনের এক সাইডে ফুলের বাগান ও এক সাইডে ছোটো শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরে দক্ষিণ দিকে ফুটে আছে লাল লাল পদ্ম ফুল, পানির ওপর ভেসে আছে সামিয়ানা হয়ে পদ্মের সবুজ পাতা। পুকুরের পূর্ব-দক্ষিন কোনে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি ছোট বড়ো গজারি গাছ, ছায়া নিয়ে। গজারি গাছের শুকনো পাতাও পড়ে আছে পুকুর পাড়ে ও শ্যাওলা সবুজ জলে। পদ্ম পাতার ওপর খেলা করছে দুইটি জল ময়ূর। কিন্তু চোখ দিয়ে যার হাসি ছড়ায়, সে মেয়েটিকে আজ দেখতে পাচ্ছে না, আলামিন। অথচ পরপর তিন দিন, একই সময় একই জায়গায় থাকে মেয়েটা, দূর থেকেই চোখাচোখি হয় আলামিনের সাথে। আজ রাতে ঘুমাতে পারেনি সে, এতো সুন্দর চোখ-মুখ, চোখের হাসি কোনো দিন দেখেনি। যে নারীর হাসি সুন্দর, সে সুহাসিনি। যে নারীর চোখ সুন্দর, সুনয়না। কিন্তু যে নারীর হাসিও সুন্দর, চোখও সুন্দর তাকে কী বলে জানে না আলামিন। সে কখনও কোনো মেয়ের মায়ায় পড়েনি, এমনকি মনেও আসেনি কোনো মেয়েকে ভালোবাসার। সাতটি বছর মরুভূমির দেশে কাটিয়ে এসেছে, কোনো নারীর সৌন্দর্য উপভোগ করা কিংবা দেখারও দুঃসাহস জাগ্রত হয়নি, তার হৃদয়ে। কিন্তু এই নাম অজানা অচেনা মেয়েটি তার ধনুক চোখ দিয়ে যে তীর মেরেছে আলামিনের বুকে, সে যন্ত্রণায় হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে। যার বিষক্রিয়ায় রাতের ঘুম উড়ে গেছে তপোবনে। হঠাৎ চুপিচুপি এসে পাশে দাঁড়ালো মেয়েটি,
-হ্যালো কাকে খুঁজছেন?
-(হকচকিয়ে উঠলো আলামিন), না মানে….।
-না মানে আপনি যাকে খুঁজছেন সে জুলিয়ারা হক জলি (বলেই, চোখ ও ঠোঁট একসাথে হেসে উঠলো মেয়েটির)।
-আ.. আমি আলামিন, ঐ স্কুলে আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি পড়ে (বলে, স্কুলের দিকে হাত উঁচিয়ে দেখায়)।
-আমি জানি।
-কি.. কিভাবে? (বলে তোতলায় আলামিন)।
-আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?
-না একটু লজ্জা …..
– (হা হা করে হেসে ওঠে জলি), লাজুক ছেলেদের আমার ভালোই লাগে।
-কি… কি.. (বলে জানতে চাই আলামিন)?
-জ্বি, আপনি যেটা শুনেছেন সেটায় (বলে, আবার হেসে ওঠে জলি)। তো আপনি কি করেন আলামিন সাহেব?
-আমি বিদেশে ছিলাম সাত বছর, এক সপ্তাহ হলো দেশে এসেছি, আছি ছোট বোনের বাসায়।
-বিয়ে করেছেন?
-না এখনো করিনি, মাত্র তো দেশে আসলাম। একটু একটু করে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয়ে আসে আলামিনের, তোতলামিও বন্ধ হয়ে যায় এবং সাহসী হয়ে ওঠে। সেও জানতে চাই,
-আপনার বিয়ে হয়েছে?
জলি হাসতে থাকে। যে হাসি দেখলে ভুলে যায় নিজের বাপের নামও, কী সম্মোহিত হাসি! জলি সোজাসুজি উত্তর না দিয়ে বলে,
-কি মনে হয় আপনার?
-আমি বুঝতে পারি না (উত্তর দিলো আলামিন)।
এদিকে ওদের স্কুল ছুটির সময় হয়ে গেছে। আজকে আসি বলে, স্কুলের দিকে হাঁটা শুরু করে আলামিন। তার মনটা প্রজাপতির ডানার মতো রঙিন হয়ে ওঠেছে, ফুরফুরে লাগছে শরীর, মনে হচ্ছে চাইলেই উড়তে পারবে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, এতো সুন্দরী একটা মেয়ে তার সাথে এতো সুন্দর করে কথা বলেছে! কতো ভাবনা উড়ে আসছে মনের ভেতর, ভাবতেই স্বর্গীয় অনুভূতি আসছে।
পরের দিন শুক্রবার, ভাগ্নে-ভাগ্নির স্কুল বন্ধ। কিভাবে বাইরে বের হবে তাদের রেখে, অজুহাত খুঁজছে আলামিন। ওরা মুহূর্তের জন্য মামাকে ছাড়তে চায় না। কিন্তু ওদের সাথে নিয়ে যাবে না, আলামিন। ছোট বোন লিজাকে, জরুরী এক কাজ আছে বলে বাইরে যেতে চাইছে। লিজা জানতে চাই, তোমার আবার কি কাজ? পরে বলবো, বলে বেরিয়ে পড়ে আলামিন। মিনিট পাঁচেকের রাস্তা জলির বাসা যেতে।
জলি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, একটা পাঁচ ছয় বছরের মেয়ে ফড়িং এর পিছনে দৌড়াচ্ছে। সেদিকেই তাকিয়ে আছে উদাস নয়নে জলি। শুক্রবারের সকাল, রাস্তায় মানুষের চলাচল অন্যান্য বারের থেকে তুলনামূলকভাবে কম। বাড়ির গেটের কাছাকাছি এসে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়লো আলামিন এবং কন্ঠ নরম মিষ্টি করে জানতে চাইলো,
– জলি কেমন আছেন?
– এইতো ভালো, আপনি কেমন আছেন?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো, জানালো আলামিন। আপনার মন খারাপ নাকি?
– না তো! ঠিক ই তো আছে।
বলেই, সেই চোখ ও মুখের মন ভুলানো হাসি ছড়িয়ে দিলো ইথারে ইথারে। পদ্ম পাতার ওপর ঝরে পড়লো শুকনো গজারি পাতা, ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়াল দিলো জল ময়ূর ও জল ময়ূরী।
– কি ভাবছেন আলামিন সাহেব?
– না তেমন কিছু না।
– ভেতর আসেন? বলে গেট খুলে ধরলো জলি। না করতেই গিয়েও না করতে পারলো না আলামিন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সম্মোহিত হয়ে পড়েছে, আলামিনের মন। সে তো জলির কাছাকাছি যেতেই চাই, তার সাবকন্সাস মাইন্ড তাকে এটাই বলে রেখেছে। তার আর সাধ্য নাই, জলির মায়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার।
– বাচ্চা টা কে জলি?
– আমার বোনের মেয়ে, আমার কাছেই থাকে, নাম জুঁই। আপনার ভাগ্নে-ভাগ্নীদের স্কুলেই পড়ে।
– কেমন আছো আম্মু? তুমি কি খাবে, তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসি?
– না এখন দরকার নাই, অন্য দিন আনবেন। ভেতরে চলেন, চা খাবেন। ও হ্যাঁ আলামিন সাহেব, জুঁই আমার কাছে ছোটো থেকেই থাকে সেজন্য আমাকেই আম্মু ডাকে, কিছু মনে করবেন না।
– না না কিছু মনে করবো কেনো, ঠিক ই তো আছে।
জুঁই কোনো কথা বলে না, অচেনা মানুষ দেখে লজ্জায় লিজাকে আড়াল করে হাঁটছে। যদিও জুঁই তার বোনের মেয়ে কিন্তু দেখতে লিজার মতোই। নাক, চোখ, ভ্রু, ঠোঁট সবই যেনো লিজার ফটোকপি। মনে হচ্ছে, এই বয়সে লিজাও দেখতে এমনি ছিলো! হতেই পারে, কারণ জুঁই লিজার বড়ো বোনের মেয়ে, তার বোনও নিশ্চয়ই লিজার মতোই দেখতে হবে!
এরপর থেকে প্রতিদিন ভাগ্নে-ভাগ্নিকে স্কুলে দিয়ে, লিজার বাসায় আসে আলামিন। লিজার বোনের মেয়ে জুঁইও স্কুলে চলে যায়। ওরা ধীরে ধীরে একে অন্যের অনেক কাছাকাছি চলে আসে এবং মেতে ওঠে আদিম বন্যতায়। এভাবেই পাঁচ মাস কেটে যায়। হঠাৎ একদিন লিজা জানায়, সে প্রেগন্যান্ট। এ কথা শুনে খুব খুশি হয় আলামিন, সে বাবা হবে! মনের ভেতর ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তারা এখনও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি, মনে পাপবোধ জেগে ওঠে। সমাজ কি বলবে! এই সমাজের দ্বারাই লাঞ্ছিত হয়েই গ্রাম ছেড়ে দিয়েছিলেন আলামিন। ভাবে এটা গ্রাম না শহর, ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে কি হয় কেউ কারও রাখে না খবর। শুধু সতর্ক থাকতে হয়, মহল্লার ইয়াবাখোর পোলাপান থেকে।
এসব প্রেম ভালোবাসার কথা আলামিন কাউকে জানায়নি, জানানোর মতো কোনো বন্ধু নাই, আপনজনও নাই একমাত্র ছোট বোন ছাড়া। লিজার বাসায় পাঁচ মাস থেকে আছে, তাকেও জানায়নি। ওদিকে জলি ও আলামিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, আলাদা বাস নিবে এবং বিয়ে করবে। জলি যে বাসায় থাকে, সেখানে আর থাকা সম্ভব না। আর কিছুদিন গেলেই তার প্রেগন্যান্সির লক্ষণ গুলো ভেসে উঠবে, তাই দ্রুত বাসা চেঞ্জ করেন অন্যত্রে চলে যেতে হবে। আলামিন, লিজাকে জানায় সে গ্রামের বাড়ি যাবে? লিজা অবাক হয়!
– তুমি গ্রামে কার বাড়ি যাইবা? কে আছে ওখানে? যাওয়ার দরকার নাই। এখানে তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে ভাই?
– আমার গ্রামে যেতেই হবে, কিছু কাজ আছে। আর তোর শ্বশুরবাড়ি, মেজো ফুফুর বাসাতেই থাকবো, সপ্তাহ খানেক পরে চলে আসবো।
বাড়ি যাওয়ার জন্য মিথ্যা কথা বলে, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, পরের দিন বোনের বাসা থেকে চলে আসে আলামিন। জলি ও আলামিন দুই রুমের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে জয়দেবপুর ছায়াবীথি এলাকায়। এবং এক সপ্তাহ পর একটি কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করেন চুপিচুপি। আলামিন সাত বছর বিদেশ থাকায়, তার কাছে তেত্রিশ লক্ষ টাকা আছে। ভালো বেতন পেতেন, বাড়িতে কারো কাছে কোনো টাকা পাঠানোর দায়বদ্ধতা না থাকায় এতো টাকা জমাতে পেরেছে। সেই যে এতো টাকার মালিক, তার বোন লিজাও জানতো না এবং কখনো সে জানতেও চায়নি। শুধু দেশে আসার সময় দেড় ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ও দশ আনা ওজনের এক জোড়া কানের দুল দিয়েছে ভাগ্নির জন্য। কিন্তু তার এই বিশাল অংকের টাকার কথা জানে না তার স্ত্রী জলি ছাড়া। এবং আলামিন কে পরামর্শ দেয় এই টাকা রেখে দিতে অযথা খরচ না করতে। বাসার কাছেই একটি মুদির দোকান দেয় জলি ও আলামিন। সুখে-শান্তিতে কাটছে তাদের দিন। আলামিন এক সপ্তাহের কথা বলে বোনের কাছ থেকে চলে এসেছে, আর ফিরে যায়নি। মোবাইল নাম্বার চেঞ্জ করে ফেলেছে। হাজার হাজার বার লিজা ফোন করেও যোগাযোগ করতে পারেনি একমাত্র ভাইয়ের সাথে। লিজা গ্রামের বাড়িও গিয়েছিল ভাইয়ের খোঁজে, কিন্তু আলামিন বাড়ি যায়নি। ফিরে আসে কাঁদতে কাঁদতে, মা চলে গেছে, বাবা মারা গেছে, ভাইটাও হারিয়ে গেলো। লিজা ও লিজার স্বামী গাজীপুরে এসে থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করে রাখলেন।
এভাবেই কেটে গেলো তিনটি বছর, আলামিন ও জলির ছেলে সন্তান হয়েছে, নাম রেখেছে জুয়েল। জুয়েলের বয়স দুই বছর পার হলো। ওদের এখন চার জনের সংসার। জলির বোনের মেয়ে জুঁই এখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। জলির ও আলামিনের নিজের মেয়ের পরিচয়ে বড় হচ্ছে। আলামিন প্রথম প্রথম অনেক অবাক হতো, জুঁইয়ের খোঁজখবর তার মা-বাবা কেনো নেয় না! জলি তাকে জানিয়েছিল, জুঁইয়ের বাবা তার বোনকে ছেড়ে চলে গেছে এবং জুঁইয়ের মা বিদেশে গেছে, তার কাছে জুঁইকে রেখে। জলি এখানে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে লেখাপড়া করেন। সে আরও জানায়, জলি ও শিউলি দুই বোন, পৃথিবীতে আর তাদের কেউ নাই, আলামিনের মতোই এতিম তারা। আলামিনও কখনো আর কিছু জানতে চাইনি, আপন মেয়ের মতোই করে, শিউলির মেয়ে জুঁইকে ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করছে। জলিকে এতো পরিমান ভালোবাসে যে, আলামিনের তার সবকিছুই ভালো লাগে। এই তিন বছরের বৈবাহিক জীবনে, কখনো একটিবারের জন্যও কখনো রাগ করেনি লিজার ওপর। আলামিনের কোনো পিছুটান নেই, জলি ছাড়া। জলির একটু সুখের জন্য নিজেকে কুরবানী করতেও সবসময় প্রস্তুত আলামিন। ছেলেমেয়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসে স্ত্রী জলিকে।
জলি একদিন আদুরে গলায় বললো, আর ভাড়া বাসায় থাকতে চাই না, নিজেরাই একটি সুন্দর বাসা বানাতে চায়, জানায় আলামিনকে। আলামিনও রাজি হয়ে যায়, জানায় তুমি যা ভালো মনে করো, তাই হবে। তারা বাড়ি বানানোর জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে, এবং একটি আড়াই কাঠা জমি ওদের পছন্দ মতো পায়। দাম পঁয়তাল্লিশ লক্ষ টাকা। কিন্তু এতো টাকা নাই আলামিনের কাছে, এখন সব মিলিয়ে তিরিশ লাখের মত আছে। সেই তিরিশ লক্ষ টাকা ব্যাংকে থেকে উঠায় আলামিন, এবং বাকি পনেরো লক্ষ টাকা শোধ করার জন্য ছয় মাসের সময় নেয়। জমি দেখিয়ে ব্যাংক লোন নিয়ে শোধ করে দিবে।
খুব সকালেই ছেলের কান্নাকাটিতে ঘুম ভেঙে যায় আলামিনের। জুয়েল বিছানায় বসে কাঁদছে, জলি বিছানায় নাই। ছেলেকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে আবার ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু কান্না বন্ধ হয় না। আলামিন জোরে জোরে জলিকে ডাক দেয়, দ্রুত বাথরুম থেকে বের হও, জুয়েল কাঁদে, তাকে থামাও। এভাবেই মিনিট পাঁচেক চলে যায়, বাথরুম থেকে কেউ বের হয়ে আসে না। বিছানা ছেড়ে উঠে আলামিন, ছেলেকে কোলে করে। বাথরুমের দরজা খোলা, ভেতরে কেউ নাই। মেয়ে জুঁইয়ের রুমে যায় আলামিন, জুঁই ঘুমাচ্ছে, এখানেও নাই জলি। গেলো কোথায়? ফিরে আসে নিজ ঘরে, ওয়ারড্রব খোলা! টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে জলি, আকাশ ভেঙে পড়লো মাথার ওপর। বুকে জড়িয়ে আছে ছেলে জুয়েলকে, হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো আলামিন, পাশে এসে দাঁড়ালো জলির বোনের মেয়ে জুঁই। কি হয়েছে বাবা, কাঁদছো কেনো? তোমার আম্মু পালিয়ে গেছে মা। জুঁইও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, তার বাবাকে জড়িয়ে। জুঁই জানে, আলামিন ই তার জন্মদাতা বাবা। মা কেনো পালাবে বাবা, আমাদের রেখে? জানি না তো মা, বলে কান্নায় লুটিয়ে পড়ে আলামিন। ঘুম ভেঙ্গে যায় জুয়েলের, বাবা ও বোনের কান্নাকাটি দেখে, মা মা করে কাঁদতে থাকে আড়াই বছরের জুয়েল। তিনটি কন্ঠের কান্নার রোলে, জেগে যায় ফ্ল্যাটের সকল বাসিন্দা।
আমি পদ্ম পাতার জল ময়ূর; প্রিয়জন হতে কাছে এসেছিলাম, তোমাকে নিয়ে আজীবন বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি জল ময়ূরী হয়ে এসেছিলে প্রয়োজনে। তারপর প্রয়োজন শেষে উড়ে গেলে, নতুন কোন প্রিয়জন প্রত্যাশীর কাছে, লুটে নিতে। জলি, বারো ভাতারী হৃদয় তোমার! জলিকে খোঁজাখুঁজির কোন পরিচিত জায়গা ছিল না, আলামিন তার সম্পর্কে কিছুই জানে না বলতেই চলে। জলি যা বলেছে তাই সে অন্ধবিশ্বাস করেছে। তাই অযথা খোঁজাখুঁজি করলো না। মানুষ হারিয়ে গেলে হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু পালিয়ে গেলে যায় না; এইটা আলামিন ভালো করেই জানে।
লিজা দরজা খুলতেই দেখে তার ভাই আলামিন! দেখেই কাঁদতে কাঁদতে বললো, এতো দিন কোথায় ছিলা? এরা কারা?
– আমার মেয়ে জুঁই ও ছেলে জুয়েল।
– তুমি বিয়ে করেছো! ভাবি কোথায়? আর এতো বড়ো মেয়ে তোমার?
– সে নাই, আমাদের মায়ের মতো, ওদের মা’ও পালিয়ে গেছে।
– তুমি বিয়ে করেছো, আমাকে বলো নি কেনো ভাই? আমি ছাড়া তোমার কে আছে? আর আমাকেও বলার প্রয়োজন মনে করলে না, ভেতরে আসো তোমরা?
লিজার একটা বিষয় মাথায় ধরছে না, তার ভাই বিদেশ থেকে এসেছে তিন বছর হলো। আট-নয় বছরের একটা মেয়ে, তার মেয়ে হয় কিভাবে! ভাই মিথ্যে বলছে না তো। ছেলের বয়স ঠিক আছে। তাই আলামিনকে জিজ্ঞাসা করে, ভাই আট- নয় বছরের মেয়ে, তোমার হয় কিভাবে! তুমি তো এসেছো তিন বছর হলো? আলামিন বোনের কাছে সবকিছু গোপন রেখে মিথ্যা বলে, লিজা তোকে বলিনি মনে কষ্ট পাবি বলে, আমার বিয়ে করা দশ বছর হলো। বিদেশ যাওয়ার পর, মোবাইলে কথা বলতাম ওদের মায়ের সাথে। বিদেশ যাওয়ার এক বছর পর ছয় মাসের ছুটিতে আসি এবং বিয়ে করি। তখন জুঁই ওর মার পেটে আসে। এবং এবার এখান থেকে যাওয়ার পর জুয়েলের জন্ম। সব মিথ্যা গল্প বলে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয় লিজাকে। লিজা শুধু বলেছিল, তুমি শক্ত মনের মানুষ জানতাম, কিন্তু এতোটা যে পাষাণ জানা ছিলো না, তুমি তোমার একমাত্র বোন কেউ এগুলো বলোনি, ভাই?
সব মিথ্যেগুলো সত্যি হয়েই বেড়ে ওঠছে। পৃথিবীর কাউকে বুঝতে দেয়নি আলামিন, যে জুঁই আলামিনের মেয়ে না। কেটে যায় আরও চারটি বছর। লিজার স্বামী যে কোম্পানিতে করে, সেই কোম্পানিতে একটা পায়। চাকরি করতে থাকে, সম্বলহীন হয়ে। ভাই-বোন এক বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকে। ওদের ছেলেমেয়ে বড়ো হয়ে উঠছে।
শুক্রবারের সকাল, অফিস ছুটি, ঘুমিয়ে আছে আলামিন। জুয়েল এসে বললো,
– বাবা এক মহিলা তোমাকে নিচে ডাকছে? বেঞ্চে বসে আছে।
– যাও তো বাবা, ঘুমাতে দাও দুষ্টুমি করো না?
– সত্যি বাবা তোমার জন্য, তিনি অনেক সময় অপেক্ষা করছে?
বিছানা ছেড়ে আলামিন উঠলেন বিরক্তি নিয়ে, তাকে তো পৃথিবীর কোনো মহিলা ডাকার কথা না! কে আসলো অবেলায়? ব্রাশ না করেও একটা শার্ট পরিধান করে, বোতাম লাগাতে লাগাতে নিচে নামলেন। নিচে এসেই তো চক্ষু চড়কগাছ! মেজাজ ঠিক রাখতে পারলেন না আলামিন।
চুতমারানি তুই কেনো আবার এসেছিস? তোর স্বভাব তো জল ময়ূরীর মতো! জল ময়ূরকে ছলনায় কাছে ডেকে, চোদা দিয়ে দুই-তিনটা ডিম হাতে ধরিয়ে ফুড়ৎ করে উড়ে যায় নতুন নাঙ্গের খোঁজে। অসহায় পুরুষ ময়ূর পদ্ম পাতার ওপর বাসা বেঁধে বুকে ডিম আগলে রেখে, ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ফুটিয়ে তুলে বাচ্চা; তবুও জল ময়ূরী ফিরে আসে না। মা জাতিও যে হারামি হয় জল ময়ূরী তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর তুইও সেইরকম নারী; পুরুষ মানুষ দেখলেই, চোখে কাজল ঠোঁটে মুচকি হাসি দিয়ে কাছে ডেকে কিছু দিন প্রেমের ওম দিয়ে, ধরিয়ে দিস হাতে হারিকেন পাছায় বাঁশ। তারপর অনন্তকাল জ্বলতে থাকে সলতে, বুকের ভেতর।
তোর মতো সতীর চেয়ে বেশ্যাও ভালো। যা ভাগ!
বাবার পিছনে এসে দাঁড়ায় জুয়েল ও জুঁই।
– বাবা?



