মহানন্দার তীরে

নিঃসঙ্গের মহাযুদ্ধ: একটি রাজপথ ও এক তৃষিত প্রাণ

শহরের ধমনীর মতো বিস্তৃত সেই পিচঢালা কালো রাস্তাটা আজ যেন এক ক্ষুধার্ত অজগর। রৌদ্রদগ্ধ দ্বিপ্রহরে তার গা দিয়ে আগুনের হল্কা উঠছে.......

নিঃসঙ্গের মহাযুদ্ধ: একটি রাজপথ ও এক তৃষিত প্রাণ

শহরের ধমনীর মতো বিস্তৃত সেই পিচঢালা কালো রাস্তাটা আজ যেন এক ক্ষুধার্ত অজগর। রৌদ্রদগ্ধ দ্বিপ্রহরে তার গা দিয়ে আগুনের হল্কা উঠছে। 

সেই উত্তপ্ত জঠরের একপাশে থমকে দাঁড়িয়ে আছে ‘লালু’— যার পরিচয় কেবল একমুঠো অবহেলা আর এক বুক না বলা আর্তি। 

লালু কোনো অভিজাত বংশের কুকুর নয়, সে এই ধুলো-বালিরই সন্তান। কিন্তু আজ তার চোখে যে আতঙ্ক,

তা কোনো সাধারণ ভয়ের চেয়েও গভীর; তা হলো অস্তিত্ব রক্ষার আদিম লড়াই।

রাস্তার ওপারে ধুলোমাখা অশ্বত্থ গাছের নিচে একটা ভাঙা মাটির পাত্রে এক চিলতে জল চিকচিক করছে। 

তৃষ্ণায় লালুর তালু শুকিয়ে কাঠ, কণ্ঠনালী যেন মরুভূমি। অথচ মাঝখানে এই ‘লৌহ-সমুদ্র’। একটার পর একটা যান্ত্রিক দানব—বাস, লরি, ট্রাক—প্রচণ্ড গর্জনে ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে। তাদের চাকার ঘর্ষণে পিচ থেকে ওঠা তপ্ত গন্ধ লালুর ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে অবশ করে দিচ্ছে। 

প্রতিটি হর্ন যেন এক একটা বজ্রপাত, যা ওর ক্ষুদ্র হৃদপিণ্ডটাকে কামারের নেহাইয়ের মতো পিটিয়ে চলেছে।

লালু একবার সামনের পা বাড়াল। অমনি একটা দানবীয় ট্রাক কর্কশ শব্দে বাতাস চিরে বেরিয়ে গেল। বাতাসের সেই প্রচণ্ড ধাক্কায় লালু টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ল রাস্তার ধারে। 

ওর মনে হলো, এই পৃথিবীটা বোধহয় আর ওদের মতো চারপেয়েদের জন্য নয়। এখানে গতির দাপট আছে, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন শোনার ফুরসত নেই। মানুষগুলো কী অদ্ভুত! লোহার খাঁচায় বন্দি হয়ে ওরা কী এক অজানা গন্তব্যের দিকে অন্ধের মতো ছুটে চলেছে। কেউ একবারও ফিরে তাকাচ্ছে না এই পথের ধারে পড়ে থাকা এক তৃষ্ণার্ত প্রাণের দিকে।

লালুর ধূসর চোখের মনিতে ফুটে উঠল এক গভীর দার্শনিক বিষাদ। সে ভাবল, “এই যে কালো রাস্তা, যা প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণের রক্ত শুষে নেয়, এর কি শেষ নেই? এই যে চাকার ঘূর্ণন, এ কি কেবলই এগিয়ে যাওয়ার জন্য, নাকি পিষে ফেলার জন্য?” ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল ওর সঙ্গীদের মুখ, যারা কোনো এক গোধূলি বেলায় এই গতির নেশার বলি হয়েছিল। ওদের নিথর দেহগুলো এই রাজপথের ধুলোয় মিশে গিয়েছিল, কিন্তু এই যান্ত্রিক সভ্যতা থামেনি এক মুহূর্তের জন্যও।

সূর্য তখন পাটে নামছে। আকাশের কোণে রক্তের মতো লাল আভা। লালুর ধৈর্য আর তৃষ্ণা যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখনই এক অলৌকিক স্তব্ধতা নামল শহরে। সিগন্যালের রক্তচক্ষু জ্বলে উঠল। গর্জন করতে থাকা দানবগুলো হঠাৎ শান্ত হয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্তের সেই নৈশব্দ্যে লালু অনুভব করল এক অদ্ভুত মুক্তি।

সে আর দ্বিধা করল না। টলমলে পায়ে তপ্ত পিচের ওপর দিয়ে সে এগিয়ে চলল। দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দানবগুলোর ইঞ্জিন তখনও গোঙাচ্ছে, যেন শিকারি বাঘ শিকারের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে। লালুর মনে হলো, সে যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিপথ পার হচ্ছে। রাস্তার মাঝখানে পৌঁছে সে একবার থামল। জানলার কাঁচের ওপারে বসা এক মানুষের চোখের সাথে ওর চোখ মিলে গেল। সেই চোখে না ছিল ঘৃণা, না ছিল মমতা— কেবল এক অসীম উদাসীনতা।

অবশেষে ওপারে পৌঁছল লালু। অশ্বত্থের ছায়ায় সেই মাটির পাত্রের জলটুকু যখন তার তৃষ্ণার্ত জঠর স্পর্শ করল, তখন তার মনে হলো— এই এক আজলা জলই পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্যের চেয়ে দামি। ওপার থেকে ভেসে আসা গাড়ির হর্নগুলো এখন আর তাকে আতঙ্কিত করছে না, বরং মনে হচ্ছে এক পরাজিত শত্রুর হাহাকার।

সন্ধ্যায় যখন শহুরে আলোয় রাস্তাটা মায়াবী হয়ে উঠল, লালু তখন গাছের নিচে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে। তার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে এক ক্লান্ত বিজয়ীর প্রশান্তি। সে জেনে গেছে, এই নিষ্ঠুর যান্ত্রিক অরণ্যে টিকে থাকতে হলে শুধু গায়ের জোর নয়, অসীম ধৈর্য আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় থাকতে হয়— যেখানে যন্ত্র হার মানে প্রাণের তৃষ্ণার কাছে।

Facebook
LinkedIn

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

“আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে… মহুয়া আমি নিজেই।”

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা……

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে……

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top