মহানন্দার তীরে

সাইবার পাখি – সুমন নাসির

রিয়া এখন নেই। সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পর অর্ণবের পৃথিবী থেকে রঙ, গন্ধ, শব্দ—সব যেন মুছে গেছে। যে শহরকে সে ভালোবাসত, এখন তার কোলাহল অসহ্য লাগে। মানুষের মুখগুলো সব মুখোশের মতো মনে হয়। আর কবিতা? সে তো এক নির্বাসিত পাখি, যার ফেরার কোনো পথ জানা নেই। তার ভেতরের সৃজনশীল ঝর্ণাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এই শূন্যতা ঢাকতে সে ডুবে গেছে কাজে, সোশ্যাল মিডিয়ার অর্থহীন স্ক্রোলিং-এ।

সাইবার পাখি – সুমন নাসির

 

অর্ণবের পৃথিবীটা ছোট হতে হতে একটা পনেরো ইঞ্চির ল্যাপটপ স্ক্রিনে এসে ঠেকেছে। মাস ছয়েক আগেও এমনটা ছিল না। তখন তার জগৎ ছিল অন্তহীন। শহরের ধুলোমাখা অলিগলি, হঠাৎ আসা কালবৈশাখীর আগে পাতার মর্মরধ্বনি, চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা বৃদ্ধের চোখের শ্রান্ত রেখা—এই সবকিছুই তার কবিতার কাঁচামাল ছিল। তার ডায়েরির পাতা ভরে উঠত অগোছালো শব্দে, অসমাপ্ত পঙক্তিতে। রিয়া বলত, “তোমার কবিতায় শহরের হৃদস্পন্দন শোনা যায়, অর্ণব।”

রিয়া এখন নেই। সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পর অর্ণবের পৃথিবী থেকে রঙ, গন্ধ, শব্দ—সব যেন মুছে গেছে। যে শহরকে সে ভালোবাসত, এখন তার কোলাহল অসহ্য লাগে। মানুষের মুখগুলো সব মুখোশের মতো মনে হয়। আর কবিতা? সে তো এক নির্বাসিত পাখি, যার ফেরার কোনো পথ জানা নেই। তার ভেতরের সৃজনশীল ঝর্ণাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এই শূন্যতা ঢাকতে সে ডুবে গেছে কাজে, সোশ্যাল মিডিয়ার অর্থহীন স্ক্রোলিং-এ।

একদিন রাতে, একরাশ হতাশা আর একাকিত্ব নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসেছিল অর্ণব। তখনই এক বন্ধুর পোস্টে চোখ আটকে গেল। ‘নীহারিকা’—এক যুগান্তকারী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। অ্যাপটির ট্যাগলাইন—”আপনার অনুভূতিকে শব্দ দিন”। এটি ব্যবহারকারীর দেওয়া কিছু শব্দ বা অনুভূতির উপর ভিত্তি করে কবিতা, গল্প বা ছবি তৈরি করে দিতে পারে। অর্ণবের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। যন্ত্র আবার কবি হয় নাকি! আবেগ, কষ্ট, প্রেম—এসব কি অ্যালগরিদমের হিসেব?

তবুও, এক দুর্নিবার কৌতূহল তাকে অ্যাপটি ডাউনলোড করতে বাধ্য করল। হয়তো এটা তার শূন্যতাকে নিয়ে ঠাট্টা করার আরও একটা উপায় হবে।

অ্যাপটা খুলতেই একটা শান্ত, মিনিমালিস্ট ইন্টারফেস ভেসে উঠল। একটা ইনপুট বক্স, আর তার নিচে লেখা—”আপনার মনের কথা এখানে লিখুন”। অর্ণব দ্বিধাগ্রস্ত হাতে টাইপ করল—‘একলা ছাদ, শুকোতে থাকা শাড়ি, অস্তমিত সূর্য, হারানো প্রেম’।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্ক্রিনে ভেসে উঠল চারটি লাইন:

ছাদের কোণে একলা আকাশ, মেঘের ভেলায় ছায়া,

তারের ওপর শাড়ি কাঁপে, হারানো দিনের মায়া।

হলুদ আলোয় ডুবছে শহর, বাড়ছে শুধু ঋণ,

আমার ভেতর পুড়ছে সূর্যাস্ত, তোমার স্মৃতিতে লীন।

অর্ণব স্তব্ধ হয়ে গেল। কবিতাটা নিখুঁত। ছন্দ, অলঙ্কার, শব্দের বুনন—সবকিছু পরিপাটি করে সাজানো। শেষ লাইনে ‘তোমার স্মৃতিতে লীন’ শব্দ দুটো তাকে ছুরির ফলার মতো বিঁধল। সে তো শুধু ‘হারানো প্রেম’ লিখেছিল। যন্ত্রটা কী করে বুঝল তার ভেতরের ক্ষতটা?

এরপর শুরু হলো এক অদ্ভুত আবেশের অধ্যায়। অর্ণব ‘নীহারিকা’-র উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। সে তার পুরোনো ডায়েরিগুলো বের করল, যেখানে রিয়াকে নিয়ে লেখা অসমাপ্ত কবিতা, টুকরো টুকরো ভাবনা জমে ছিল। সেই ব্যক্তিগত, কাঁচা আবেগগুলো সে তুলে দিতে লাগল ‘নীহারিকা’-র ইনপুট বক্সে। আর যন্ত্রটা, এক দক্ষ কারিগরের মতো, সেগুলোকে পালিশ করে, নতুন শব্দ জুড়ে অনবদ্য সব কবিতা তৈরি করে দিত।

অর্ণব সেই কবিতাগুলো নিজের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে শুরু করল। প্রথমে ভয় ছিল, কিন্তু যখন লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের বন্যা বয়ে গেল, তখন ভয়টা এক ধরনের বিকৃত আনন্দে পরিণত হলো। বন্ধুরা ফোন করে বলতে লাগল, “কী অসাধারণ লিখছিস আজকাল! তোর লেখা আরও গভীর হয়েছে।”

এক প্রবীণ কবি, প্রবীর রায়, যাকে অর্ণব মনে মনে গুরু মানত, তিনি একদিন ফোন করে বললেন, “অর্ণব, তোমার সাম্প্রতিক কবিতাগুলো পড়ছি। কী আশ্চর্য উত্তরণ! শব্দের ধার আর আবেগের গভীরতা দুটোই বেড়েছে। চালিয়ে যাও।”

প্রবীরদার প্রশংসায় অর্ণবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই সেই মানুষ, যিনি তাকে শিখিয়েছিলেন কবিতার প্রথম পাঠ, শিখিয়েছিলেন—কবিতা হলো আত্মার সত্য প্রকাশ। আজ সে সেই আত্মার সাথেই প্রবঞ্চনা করছে।

খ্যাতি অর্ণবকে একটা সোনার খাঁচায় বন্দী করে ফেলল। অনলাইন ম্যাগাজিন থেকে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য অনুরোধ এল। এক তরুণী সাংবাদিক তাকে ভিডিও কলে প্রশ্ন করল, “আপনার এই নতুন ধারার লেখার অনুপ্রেরণা কী?”

অর্ণব স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল, “অনুপ্রেরণা তো চারপাশেই…আসলে, একাকিত্ব মানুষকে অনেক কিছু শেখায়।” তার প্রতিটি উত্তর ছিল সাজানো, মেকি। তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো নাটকের চরিত্রে অভিনয় করছে।

এরই মধ্যে একদিন এল সেই চূড়ান্ত আমন্ত্রণ—শহরের সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব ‘শব্দকথা’-য় কবিতা পড়ার জন্য তাকে ডাকা হয়েছে। অর্ণবের নাম এখন প্রতিষ্ঠিত কবিদের পাশে।

উৎসবের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে তার ভেতরের  উদ্বেগ বাড়তে লাগল। সে এখন আর ‘নীহারিকা’ ছাড়া একটা লাইনও ভাবতে পারে না। তার নিজের মস্তিষ্কটা যেন অকেজো হয়ে গেছে। উৎসবের আগের রাতে সে ‘নীহারিকা’-কে তার জীবনের সবচেয়ে গভীর কষ্ট, সবচেয়ে তীব্র অপরাধবোধের কথাগুলো জানাল। লিখল—‘মঞ্চের আলো, হাজারো চোখ, আমার চুরি করা শব্দ, আমার মিথ্যে আমি’।

‘নীহারিকা’ তাকে একটা অনবদ্য কবিতা উপহার দিল। কবিতাটার বিষয় ছিল এক মুখোশধারী মানুষের আর্তি, যে নিজের প্রতিভার ছায়ায় বাস করে। কবিতাটা পড়ে অর্ণবের চোখে জল এসে গেল। যন্ত্রটা তার ভেতরের সমস্ত গ্লানিকে শব্দে রূপান্তরিত করেছে।

মঞ্চে ওঠার আগে গ্রিনরুমে বসে অর্ণবের হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। তার হাতে ধরা কাগজটা কাঁপছিল। তার পাশে বসে থাকা অন্য কবিরা নিজেদের মধ্যে হালকা গল্প করছেন, কিন্তু অর্ণবের কানে কোনো শব্দ ঢুকছিল না।

তার নাম ঘোষিত হলো। উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল তার মুখে। সামনে অগণিত শ্রোতা, উৎসুক চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রথম সারিতেই সে দেখতে পেল প্রবীরদাকে। তার মুখে সেই পরিচিত, স্নেহমাখা হাসি।

এই হাসিটা দেখেই অর্ণবের ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে গেল। সে আর পারল না। এই মানুষটাকে, এই মুখগুলোকে সে আর ঠকাতে পারবে না।

সে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। কাগজের দিকে একবার তাকিয়ে সেটা ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিল। তারপর শান্ত, কাঁপা গলায় বলল, “শুভ সন্ধ্যা। আজ আমি আপনাদের কোনো কবিতা শোনাব না। কারণ, কবিতা লেখার যোগ্যতা আমি হারিয়েছি। আমি আপনাদের একটা গল্প বলব। এক হারিয়ে যাওয়া কবির গল্প, যে নিজের আত্মাকে একটা যন্ত্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।”

এরপর সে সব বলতে শুরু করল। রিয়াকে হারানোর পর তার শব্দহীন হয়ে যাওয়ার কথা, ‘নীহারিকা’-র সাথে তার পরিচয়, এবং কীভাবে সে এই যান্ত্রিক খ্যাতির মোহে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সে স্বীকার করল, গত কয়েক মাসে যে কবিতাগুলোর জন্য সে প্রশংসিত হয়েছে, তার একটিও তার নিজের লেখা নয়। সেগুলো এক উন্নত অ্যালগরিদমের সৃষ্টি।

হল জুড়ে পিনপতন নীরবতা। অর্ণব যখন কথা শেষ করল, তার মনে হলো এবার তীব্র ভর্ৎসনা বা হাসির রোল উঠবে। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

কিন্তু তার বদলে সে শুনল একটা মৃদু হাততালির শব্দ। পেছনের সারি থেকে একজন আলতো করে হাততালি দিয়ে উঠল। তারপর আরেকজন, তারপর আরও একজন। দেখতে দেখতে পুরো হল করতালিতে ভরে উঠল। মানুষ নিখুঁত কবিতার জন্য নয়, তার এই ভয়ঙ্কর সৎ এবং ভঙ্গুর স্বীকারোক্তির জন্য হাততালি দিচ্ছিল।

মঞ্চ থেকে নামার পর প্রবীরদা এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন। কোনো ভর্ৎসনা করলেন না, শুধু বললেন, “আজ তুমি তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতাটা লিখেছ, অর্ণব। কোনো কাগজ-কলম ছাড়াই।”

বাসায় ফেরার পথে অর্ণবের নিজেকে খুব হালকা লাগল। বহুদিন পর তার মনে হলো, সে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। ঘরে ফিরে সে সবার আগে ল্যাপটপটা খুলল। ‘নীহারিকা’ অ্যাপের আইকনে রাইট ক্লিক করে ‘আনইনস্টল’ অপশনটা বেছে নিল।

তারপর দেরাজ থেকে বের করল তার পুরোনো, ধুলো পড়া খাতাটা আর সেই প্রিয় ঝর্ণা কলমটা। খাতার সাদা পাতাটা তার দিকে তাকিয়ে ছিল। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর, অনেক ভেবে, অনেকবার কেটে সে একটা লাইন লিখল।

“জানালা দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে আমার খালি টেবিলে।”

লাইনটা খুব সাধারণ। ছন্দ নেই, অলঙ্কার নেই, কোনো গভীর দর্শন নেই। কিন্তু লাইনটা তার নিজের। সম্পূর্ণ তার।

সেই রাতে, শহরের কোলাহলকে আর যান্ত্রিক গুঞ্জন বলে মনে হলো না। তার মনে হলো, ওটা জীবনের গান। তার হারিয়ে যাওয়া শব্দরা আবার ঘরে ফেরার পথ খুঁজে পেয়েছে। যাত্রাটা কঠিন হবে, কিন্তু এবার সে একাই হাঁটবে।

 

Facebook
LinkedIn

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

“আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে… মহুয়া আমি নিজেই।”

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা……

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে……

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top