মহানন্দার তীরে

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে......

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

মহানন্দা নদী যেন এক অসীম কবিতা—ধীরে ধীরে বয়ে চলে, তার জলে সূর্যের আলো টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে ওঠে, আর পোল্লাডাঙ্গা গ্রাম তার তীরে শুয়ে থাকে যেন এক প্রাচীন স্বপ্নের মধ্যে। নদীর বুকে সকালের কুয়াশা জড়িয়ে থাকে, বিকেলে সোনালি আলোয় ধানখেতগুলো হাসে, আর রাতে চাঁদের আলোয় গ্রামের মাটির বাড়িগুলো যেন ফিসফিস করে গল্প বলে। এই গ্রামের চৌধুরী বাড়ি ছিল সেই স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ। বিঘার পর বিঘা সবুজ ধানখেত, আম্রকাননের ঘন ছায়া, আর নদীর ঘাটে বাঁধা নিজস্ব বজরা—সব মিলিয়ে আকরাম চৌধুরীর দাপট ছিল যেন এক অদৃশ্য মুকুট, যা গ্রামের প্রতিটি মানুষের মাথায় নত হয়ে যেত।  

তাঁর একমাত্র ছেলে শুভ্র ঢাকার উজ্জ্বল আলো থেকে ফিরে এসেছিল, কিন্তু তার হৃদয় কখনোই সেই সোনার খাঁচায় বন্দি হয়নি। তার চোখে ছিল ক্যামেরার লেন্স, আর মনে ছিল এক অদম্য খোঁজ—জীবনের সেই সব ছোট ছোট গল্প, যেগুলো ধন-সম্পদের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যেগুলো শুধু হৃদয় দিয়ে ছোঁয়া যায়।  

সেবার বন্ধুদের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চল, নাচোলে গিয়েছিল শুভ্র। সেখানে লাল মাটির টিলাগুলো যেন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে—কোথাও ধূসর, শুকনো প্রান্তর, কোথাও হঠাৎ এক ঝলক সবুজ ঘাস, যেন প্রকৃতি নিজের হাতে আঁকছে এক অদ্ভুত ছবি। জিপের ভিড় ছেড়ে শুভ্র নেমে পড়ল একা, পায়ে-চলা সরু পথ ধরে। ক্যামেরা হাতে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুদের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল দূরে। বাতাসে মিশে ছিল মাটির গন্ধ, শুকনো পাতার খসখস, আর দূর থেকে ভেসে আসছিল কিছু অচেনা সুর।  

সামনে এক সাঁওতাল পাড়া। মাটির বাড়িগুলোর দেওয়ালে লাল-সাদা আলপনা ফুটে আছে যেন প্রেমের চিঠি, উঠোনগুলো ঝকঝকে নিকোনো, আর বাতাসে ভাসছে মহুয়া ফুলের মিষ্টি-তেতো গন্ধ। দূরে মাদলের মৃদু তাল বাজছে—যেন হৃদয়ের ধ্বনি। কৌতূহলের টানে শুভ্র ঢুকে পড়ল ভেতরে।  

আর তখনই চোখে পড়ল তাকে—বাহামণি।  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে। সে তখন কুয়ো থেকে জল তুলছিল। দড়ির টানে তার পেশীবহুল হাতগুলো শক্ত, কোমরের সামান্য দোলায় যেন প্রকৃতিরই ছন্দ, মুখে এক অটল কাঠিন্য—যেন এই রুক্ষ মাটিরই জীবন্ত মূর্তি, যাকে কোনো ঝড়ও নড়াতে পারে না।  

শুভ্র নিঃশব্দে ক্যামেরা তুলল। শাটারের ক্লিক শব্দে বাহামণি ঘুরে তাকাল। তার বড় বড় কালো চোখ দুটো যেন রাতের আকাশ—লজ্জা নেই, ভয় নেই, শুধু এক তীক্ষ্ণ বিরক্তি আর গভীর প্রশ্ন।  

“ছবি তুললে কেনে গো বাবু?”  

কণ্ঠস্বর গভীর, যেন খাদের জল থেকে উঠে আসা—ঠান্ডা, কিন্তু মায়ায় ভরা।  

শুভ্র অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। “না… মানে, খুব সুন্দর লাগছিল তাই।”  

“হামাদের দেখায় কী আছে? তোমরা দিকুরা তো হামাদের তামাশা বানাইছ।”  

কথাটা তীরের মতো বিঁধে গেল শুভ্রর বুকে। সে ক্যামেরা নামিয়ে নিল, গলা শুকিয়ে গেল। “আমি তামাশা করতে আসিনি। আমি… সৌন্দর্য খুঁজি।”  

বাহামণি আর একটি কথাও না বলে কলসি কোমরে তুলে নিল, হনহন করে চলে গেল। কিন্তু তার সেই চাহনি, সেই অবহেলার ভঙ্গি, সেই অহংকার—সব যেন শুভ্রর রক্তে মিশে গেল। পোল্লাডাঙ্গার নরম ঘাসে অভ্যস্ত তার পা যেন প্রথমবার অনুভব করল এই লাল মাটির তীব্র ঝাঁঝ, যা চামড়া ফুঁড়ে হৃদয়ে পৌঁছে যায়।  

সেদিন থেকে শুভ্রর মন আর ফিরল না। বন্ধুরা চলে গেল, কিন্তু সে রয়ে গেল পাশের গ্রামে তার বাবার বাথান বাড়িতে। প্রতিদিন সকালে মোটরবাইকের ইঞ্জিন গর্জন করে উঠত, আর সে ছুটে যেত সেই লাল টিলার পথে। প্রথম প্রথম বাহামণি তাকে দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নিত, চোখে সেই একই বিরক্তি। কিন্তু শুভ্র হাল ছাড়ল না। সে পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে খেলত, তাদের হাসিতে নিজের হাসি মিশিয়ে দিত। বয়স্কদের সঙ্গে বসে শুনত তাদের জীবনের গল্প—কীভাবে মাটির সঙ্গে লড়াই করে তারা ফসল ফলায়, কীভাবে মহুয়ার গান গেয়ে রাত কাটায়। তার এই নীরব আন্তরিকতা ধীরে ধীরে পাড়ার মানুষের হৃদয় গলে গেল, যেন শীতের পর বসন্তের প্রথম বৃষ্টি।  

এক বিকেলে, টিলার উপরের শিমুল গাছের নিচে বাহামণিকে একা বসে থাকতে দেখল শুভ্র। লাল ফুলগুলো তার মাথার উপর ঝরে পড়ছিল যেন আশীর্বাদ। সে সাহস করে গিয়ে বসল পাশে।  

“আজও ছবি তুলবে?” বাহামণির গলায় শ্লেষ ছিল, কিন্তু আগের মতো তীব্র নয়—যেন একটু কৌতূহল মিশেছে।  

“না। আজ তোমার গল্প শুনতে এসেছি। এই মাটির গল্প, ফুলের গল্প, তোমার গল্প।”  

সেদিন সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত কথা হলো। বাহামণি তার সরল, কিন্তু গভীর ভাষায় বলল বাহা পরবের কথা—যখন ফুল ফুটে উঠে গ্রামকে রাঙিয়ে দেয়, সোহরাইয়ের গান যখন গরুর মঙ্গল কামনা করে, আর তাদের প্রতিদিনের লড়াইয়ের কথা—মাটির সঙ্গে, অভাবের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে। শুভ্র চুপ করে শুনল। তার শহুরে জীবন যেন হঠাৎ ফাঁকা, অর্থহীন মনে হলো—যেন একটা খোলস, যার ভিতরে কিছুই নেই।  

তারপর থেকে দেখা হওয়া হয়ে গেল নিয়ম। কখনো টিলার কিনারায়, কখনো শুকিয়ে যাওয়া চৌচির পুকুরে, কখনো মহুয়া গাছের ছায়ায়। শুভ্রর শহুরে মার্জিত কথা আর বাহামণির বুনো, সত্যিকারের সারল্য মিশে গেল এক অদ্ভুত রসায়নে। প্রেম এলো কোনো ঘোষণা ছাড়াই—যেমন বরেন্দ্রের রুক্ষ মাটিতে হঠাৎ বৃষ্টি নামে, মাটি ভিজিয়ে, ফুল ফুটিয়ে, সবকিছু বদলে দিয়ে।  

বাহা পরবের সেই রাত। মাদলের তালে তালে নাচছিল সাঁওতাল মেয়েরা—তাদের খোঁপায় শাল আর পলাশ ফুলের মালা, পায়ের নূপুরের শব্দে রাত জেগে উঠছিল। আগুনের আলোয় তাদের মুখগুলো যেন জ্বলজ্বল করছিল। নাচ শেষে বাহামণি হাঁপাতে হাঁপাতে ভিড় থেকে বেরিয়ে এল। শুভ্র তার হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে গেল পাড়ার পেছনের মহুয়া গাছের নিচে। চাঁদের আলোয় তার মুখটা অপার্থিব লাগছিল—যেন স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।  

শুভ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার মুখে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, বাহা।”  

মহুয়ার মিষ্টি গন্ধে ভরা ছায়ায় দুটি শরীর, দুটি আত্মা এক হয়ে গেল। শুভ্রর মসৃণ ত্বকের পাশে বাহামণির কর্মঠ, কঠিন, সূর্যপোড়া শরীর—যেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর মিলন, যা কোনো সীমানা মানে না।  

কিন্তু এই মিলন গোপন থাকল না। খবর পৌঁছে গেল আকরাম চৌধুরীর কানে। তিনি রাগে আগুন হয়ে গাড়ি নিয়ে এলেন পাড়ায়। বাহামণির পায়ের কাছে এক বান্ডিল টাকা ছুঁড়ে ফেলে বললেন, “সাঁওতালের ষ বাচ্চা কত চাস? আমার ছেলের জীবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য কত নিবি?”  

শুভ্র গর্জে উঠল, চোখে আগুন। “যথেষ্ট হয়েছে, বাবা! টাকা দিয়ে ভালোবাসা কেনা যায় না। আমি বাহামণির সঙ্গেই থাকব।”  

আকরাম চৌধুরী কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “বেশ। তাহলে আজ থেকে চৌধুরী বাড়ির দরজা তোর জন্য চিরকালের মতো বন্ধ।”  

সেদিন পোল্লাডাঙ্গার ধনী দুলাল মরে গেল। জন্ম নিল এক নতুন শুভ্র—যে ক্যামেরা ফেলে তুলে নিল লাঙলের মুঠি, যার হাতে এখন মাটির গন্ধ, আর হৃদয়ে এক অমর প্রেম।  

অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসায় সংসার ভরে উঠেছিল। বাহামণির গর্ভে যখন প্রথম স্পন্দন জেগে উঠল, তখন বরেন্দ্রের আকাশ যেন হঠাৎ কালো হয়ে গেল। মহুয়া গাছের ছায়ায় সেই রাতের পর থেকে তার শরীরে লাল মাটির মায়া আরও গভীর হয়ে বসেছিল। কিন্তু প্রকৃতি যেন তার নিজের সন্তানকে পরীক্ষা করতে চাইল। সেবার খরা নামল অভিশাপের মতো। মহানন্দা নদীর বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, বরেন্দ্রের বুকে নেমে এল সাহারার মরুভূমি, লাল টিলাগুলো যেন আগুনে পোড়া মুখ, ধানখেতগুলো হলুদ হয়ে মাথা নুইয়ে পড়ল। চারদিকে মঙ্গার ছায়া—শিশুরা না খেয়ে কাঁদছে, গরুগুলোর পাঁজর বেরিয়ে পড়ছে, আর সাঁওতাল পাড়ার মাটির বাড়িগুলোতে শুধু শুকনো হাওয়ার ফিসফিসানি।  

বাহামণি গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে তার শরীর ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে লাগল। পুষ্টির অভাবে তার তামাটে গাল দুটো ভেঙে গেল, চোখের নিচে কালো ছায়া, হাতের রুপোর চুড়িগুলো ঝুলে পড়ল। সে তবু হাসত—সেই একই অটল হাসি, যেন লাল মাটি বলছে, “আমি ভাঙব না।” কিন্তু রাতে যখন শুভ্র তার পেটে হাত রাখত, তখন বাহামণি ফিসফিস করে বলত, “আমাদের ছেলে হবে, এই ছেলেটা যেন পলাশ ফুলের মতো লাল হয়ে থাকে, শুভ্র। আমি যদি না থাকি, চলে যাই না ফেরার দেশে, তুমি আগলে রাখবে মা ও বাবা হয়ে।” শুভ্র হতাশাগ্রস্ত হয়ে বলত, “তুমি এসব কথা বলো না বাহামণি, তুমি না থাকলে আমিও থাকব না এই ধরনীর পরে।” বাহামণি ফিসফিস করে বলতে থাকত, “তোমাকে থাকতে হবে শুভ্র, তোমাকে থাকতে হবে।”  

শুভ্র ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ল। লাঙল ধরে মাঠে নেমেও কোনো ফসল ফলল না। পানির অভাবে পুড়ে গেছে ধানের খেত। পাড়ার মহাজনের দরজায় দরজায় ঘুরে সে কয়েকশো টাকা ধার করল, কিন্তু চিকিৎসার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। শুভ্র দিশেহারা হয়ে শেষমেশ একটা চিরকুট লিখে পাঠাল পোল্লাডাঙ্গায়, সেই গ্রামেরই এক চাচার হাতে—বাবা আকরাম চৌধুরীর কাছে। “বাহামণি মরে যাবে, বাবা। আমাদের টাকার খুব প্রয়োজন, শুধু এই একবার টাকা পাঠাও। আর কোনদিন তোমার কাছে কিছু চাইব না, শুধু আমার এই অনাগত সন্তানের জন্য।”  

কিন্তু আকরাম চৌধুরীর হৃদয় পাথর, একটু টলল না। চিঠি পেয়ে তিনি শুধু একটা কথা বললেন, “যে বাড়ি ছেড়ে গেছে, তার জন্য আমার এক পয়সাও নেই। আমার কোনো সন্তান নেই।” সেই খবর যখন শুভ্রর কাছে এল, শুভ্র করুণ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল, আর দু’চোখের কোণে এই তীব্র খরায় প্রবাহমান হচ্ছে বর্ষার মতো মহানন্দার স্রোতধারা।  

বাহামণির শরীর ধুঁকতে শুরু করেছে। বিনা চিকিৎসায়, পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে পুষ্টিহীনতায় সমস্ত শরীর হলুদাভ হয়ে গেছে। যেন বিয়ের আগের হলুদের রাত। বর্ষণমুখর এক রাতে তার প্রসব যন্ত্রণা উঠল। বাইরে আকাশ ফেটে বৃষ্টি পড়ছে, ভেতরে বাহামণি ছটফট করছে। শুভ্রর হাত চেপে ধরে সে শেষবার বলল, “আমার বাচ্চা… ফুলের মতো লাল… অটল…” তারপর তার হলুদাভ জীর্ণ শরীরটা শান্ত হয়ে গেল। চিরনিদ্রায় ঢলে পড়ল বাহামণি। তার মুখে হাসির ছায়া ভেসে উঠল—যেন বলছে, “আমি তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকব, শুভ্র।”

শুভ্রর আকাশ ভেঙে পড়ল, পৃথিবীটা ভেঙে গেল মাটির হাঁড়ির মতো। সেই দিন থেকে সে আর নিজেকে চিনতে পারল না। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, ছোট্ট পলাশকে বুকে জড়িয়ে প্রতিদিন বাহামণির কবরের পাশে বসে থাকত। লাল মাটির উপর শাল ফুল ছড়িয়ে দিয়ে কাঁদত—যেন তার অশ্রু দিয়ে মাটিকে আরও লাল করে তুলছে। “বাহা… তুমি চলে গেলে কেন? আমার হৃদয়ের সেই লাল মাটির টুকরো, তুমি ছাড়া এ মাটি শুধু শুকনো ধূসর প্রান্তর হয়ে গেছে।” তার কান্না মিশে যেত বাতাসে, মহুয়া গাছের পাতায়, দূরের মাদলের তালে—যেন সমস্ত বরেন্দ্র ভূমি তার বুকের ব্যথা শুনে নীরবে কাঁদছে।

পলাশ তখন সদ্য ফোটা একটি কচি পলাশ ফুলের মতো—অবুঝ, কিন্তু তার চোখে মায়ের সেই তীক্ষ্ণ, অটল চাহনি। শুভ্র তাকে কোলে নিয়ে কবরের কাছে বসে ফিসফিস করে বলত, “দেখ, তোর মা এখানে শুয়ে আছে। সে বলেছিল, তুই যেন লাল ফুলের মতো অটল হয়ে থাকিস। আমি তোকে ভালোবাসায় আগলে রাখব, মা-বাবা দুজনের মিলিত ভালোবাসায়।” কিন্তু তার কণ্ঠে আর সেই পুরনো জোর ছিল না—শুধু এক অসীম শূন্যতা, যেন বাহামণির চলে যাওয়ায় তার জীবনের সব রঙ মুছে গেছে।

এ যেন অমর প্রেমের এক অদ্ভুত গাথা—পৃথিবীর সকল প্রেমিককে হার মানিয়ে দিয়েছে। শুভ্রর পাগলামি দেখে বরেন্দ্রের রুক্ষ লাল মাটি যেন কেঁদে ওঠে। বসন্তে যখন পলাশ ফুল ফুটে উঠে গ্রামকে রাঙিয়ে দেয়, তখনো কেন যেন সময়ের আগেই ঝরে পড়ে—যেন হাহাকার করে বলে, “এ ফুলের রঙ তোমার বাহামণির মতো, কিন্তু তোমার অভাবে সে টিকতে পারে না।” দিন দিন শুভ্র জীর্ণ হয়ে পড়ে। শরীরে সর্বদা জ্বর, চোখের নিচে কালো ছায়া, হাত-পা কাঁপে—কিন্তু নিজের কোনো খেয়াল রাখে না। খাবার ছুঁয়ে দেখে না, শুধু পলাশের মুখে দু-এক গ্রাস তুলে দেয়। তার মনে শুধু এক কথা—বাহামণির শেষ কথা: “আমাদের সন্তানকে সব সময় খেয়ালে রাখবে, ভালোবাসায় রাখবে।”

জ্বরের তাপে তার দেহ পুড়ে যায়, কাশি শুরু হয়—যেন বুকের ভেতর থেকে লাল মাটির ঝাঁঝ উঠে আসছে। কাশির সঙ্গে কান্না মিশে যায়, আর সেই কাশি-কান্নায় কেঁপে ওঠে বরেন্দ্রের লাল মাটি। অবুঝ পলাশ বাবার সঙ্গে কেঁদে চলে, তার ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার গাল মুছে দেয়—যেন বুঝতে পারে, বাবার হৃদয় ভেঙে চুরমার। এসব করুণ কাহিনী বরেন্দ্র ছাড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে—যেন এক অদৃশ্য হাওয়া বয়ে বেড়ায়, “শুভ্র পাগল হয়ে গেছে প্রেমে, তার প্রেমিকা মাটির নিচে, আর সে মাটির উপরে মরে যাচ্ছে।” কিন্তু আকরাম চৌধুরীর পাষাণ হৃদয় একটুও গলে না। তার হৃদয় ছেয়ে গেছে আভিজাত্যের মড়কে—যেন একটা পুরনো জমিদারি বাড়ির দরজা চিরকালের মতো বন্ধ।

বাহামণির কবর জড়িয়ে শুভ্রর কেটে যায় রাত দিন। প্রতিদিনের মতো কাশি ও কান্না নিয়ে কবরের কাছেই প্রলাপ করতে করতে একদিন মুখ দিয়ে হল হল করে রক্ত বের হতে শুরু করে। লাল মাটির উপর ছড়িয়ে পড়ে তার রক্ত—যেন বাহামণির সঙ্গে মিলে এক হয়ে যাচ্ছে। অবুঝ শিশু পলাশ তা দেখে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে, “বাবা… বাবা…” ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার মুখ মুছে দিতে চায়। শশুর-শাশুড়ি ও প্রতিবেশীরা দৌড়ে এসে দেখে, শুভ্রর নিথর দেহ পড়ে আছে বাহামণির কবরের উপর। তার বুকে যেন শান্তি ফিরে এসেছে—অবশেষে প্রিয়তমার কাছে পৌঁছে গেছে। পলাশ তখন আড়াই বছরের—বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে, কিন্তু তার চোখে যেন বাহামণির লাল আভা আর শুভ্রের নরম হাসি মিশে আছে।

এদিকে পোল্লাডাঙ্গার চৌধুরী বাড়িতে খবর পৌঁছেছিল। শুভ্রর মা—আকরাম চৌধুরীর স্ত্রী—ছেলের এই দুর্দশার কথা শুনে একেবারে ভেঙে পড়লেন। দিনরাত কাঁদতেন, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলেন। “আমার ছেলে… আমার শুভ্র… বরিন্দে কষ্ট পাচ্ছে!” তাঁর শরীর ক্ষয়ে যেতে লাগল। প্রতিদিন তিনি বলতেন, “আমার ছেলেকে, আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসো।” আকরাম চৌধুরী পাত্তা দিতেন না। কিন্তু সেদিন স্ত্রীর চোখের জল দেখে তাঁর ভেতরের পিতৃত্ব মোচড় দিয়ে উঠল, চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রুকণা।

আকরাম চৌধুরী একা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সেই লাল টিলার পথ ধরে, বরেন্দ্র ভূমিতে। কিন্তু শুভ্রর জীর্ণ মাটির বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখলেন—অনেক মানুষের জটলা। বাতাসে ভেসে আসছে কান্নার আওয়াজ, যেন আকাশ কাঁপছে। তিনি দৌড়ে গেলেন। আঙিনায় পড়ে আছে শুভ্রর লাশ—নিথর, বাহামণির কবর জড়িয়ে। তার বুকের উপর শুয়ে আড়াই বছরের পলাশ আহাজারি করছে। “বাবা… বাবা… ওঠো…” ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার মুখ চাপড়াচ্ছে, চোখে অবিশ্বাস। সে তো মায়ের মুখ দেখেইনি, এখন বাবাও চলে গেল!

আকরাম চৌধুরী ছেলের লাশ দেখে তাঁর পা কেঁপে উঠল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “শুভ্র! আমার ছেলে! কেউ তাকে স্পর্শ করবে না?” পলাশের অশ্রু-ধোয়া চোখের দিকে তাকিয়ে আকরাম ধপ করে নিভে গেলেন। যেন শুভ্র, তার সেই ছোট্ট শুভ্র চেয়ে আছে পৃথিবীর সব মায়া নিয়ে। নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না, কেঁদে উঠলেন বুক বিদীর্ণ করে। এসে জাপটে ধরলেন শুভ্রর বুক, একটা বুক নিয়ে কেঁদে চলেছেন যেন দুইটা অবুঝ শিশু। সেই দৃশ্য দেখে কেঁদে উঠল লাল রুক্ষ বরেন্দ্র ভূমির সমস্ত মানুষ ও প্রকৃতি।

“শুভ্রকে নিয়ে যাব। আমার ছেলেকে আমার বাড়ির গোরস্থানে শায়িত করব।” কিন্তু সাঁওতাল সম্প্রদায় একেবারে রুখে দাঁড়াল। বাহামণির বাবা-মা, গ্রামের সাঁওতাল মাঝিরা বললেন, “না! এই ছেলে আমাদের। শুভ্রর শেষ ইচ্ছা ছিল—বাহামণির পাশেই শায়িত হবে। তোমরা তো টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনতে চেয়েছিলে বাবু, পারোনি। শুভ্র আমাদের সন্তান, আমাদের গায়ের রক্ত দিয়ে দিবো কিন্তু নিতে দিবো না!”

আকরাম চৌধুরী ভেঙে পড়লেন। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমার অহংকার… আমার অহংকারই সব নিয়ে গেল। বংশের প্রদীপ নিভে গেল!” তাঁর চোখে জল, হাত কাঁপছে—জমিদারের সেই দাপট আর নেই, শুধু এখন সে এক পরাজিত বাবা।

পরের দিন আকরাম পলাশকে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু পলাশের নানা-নানি, গ্রামবাসী একেবারে মানল না। “তুমি তোমার ছেলেকে মেরেছ। এখন নাতিকেও নেবে?” ধিক্কারের ঝড় উঠল। ঠিক তখন খবর এল—পোল্লাডাঙ্গায় শুভ্রর মা ছেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। আকরাম সেই দোহাই দিয়ে গ্রামবাসীকে বোঝালেন, “আমার স্ত্রী মরে যাবে। অন্তত নাতিকে একবার দেখতে দাও। আমি শুধু তাকে নিয়ে যাব, পরে ফিরিয়ে দেব।” অনেক কষ্টে, অনেক অনুনয়ে শেষমেশ গ্রামবাসী রাজি হল।

পলাশকে কোলে তুলে নিলেন আকরাম চৌধুরী। পলাশের স্পর্শে শুভ্রর ঘ্রাণে ভেতরটা হুহু করে উঠল। যখন চৌধুরী বাড়িতে ফিরলেন, তখন শুভ্রর মা বিছানায় অচেতন। আকরাম পলাশকে কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, “দেখো, এই তোমার দাদি।” ছোট্ট পলাশ তার নরম হাতটা বাড়িয়ে দাদির কপালে ছুঁয়াল। আর অমনি শুভ্রর মায়ের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। জ্ঞান ফিরে এল। তিনি চোখ খুলে দেখলেন—সামনে একটা ছোট্ট ছেলে, যার চোখে বাহামণির সেই লাল মাটির আভা, মুখে শুভ্রের হাসি। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, “শুভ্র… শুভ্র… শুভ্র বাবা… আমার সাত রাজার ধন!” ছোট্ট পলাশ দাদির এই আহাজারি দেখে “বাবা” বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠল, জড়িয়ে ধরল দাদির গলা।

লাল মাটির মায়া কখনো শেষ হয় না। সে বয়ে চলে—প্রেমের অশ্রুতে, ত্যাগের আলোয়, অহংকারের ছাইয়ে, আর একটা ছোট্ট পলাশের হাতের স্পর্শে। আকরাম চৌধুরী আজ শুধু একজন প্রায়শ্চিত্তকারী দাদু। আর মা-বাবা হারা পলাশের চোখে যেন ফুটে উঠেছে সেই পলাশ ফুল—লাল, অটল, অমর লাল মাটির মায়া।

Facebook
LinkedIn

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

“আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে… মহুয়া আমি নিজেই।”

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা……

কিন্তু জানো তো, সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর দাগ। জীবনটা সবসময় ফিল্টার লাগানো ছবির মতো হয় না।

মুখোশের আড়ালে – সুমন নাসির

শহরটা দেখতে বড় চকচকে, বাইরে থেকে মনে হয় যেন সবকিছু সোনায় মোড়া। সন্ধ্যাবেলায় কাঁচের দালানকোঠাগুলোতে রোদ পড়লে চোখ ধাঁধিয়ে যায়,

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top