মহানন্দার তীরে

ট্রলারের মাইয়া – সুমন নাসির

Tollar

ট্রলারের মাইয়া – সুমন নাসির

বংশাল নদীর বুক চিরে ছুটে চলেছে বিশাল এক ট্রলার। ডিজেল ইঞ্জিনের ঘর্ঘর শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজছে দানবীয় সাউন্ড সিস্টেম। বিটের আঘাতে নদীর জলও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই শব্দ শুধু বিনোদন নয়, এ এক ইচ্ছাকৃত বধিরতা; এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে ভেতরের নীরব কান্না আর বিবেকের দংশনকে ডুবিয়ে রাখা যায়। আকাশটা ঘন নীল, তার নিচে সবুজের আঁচড় কেটে যাওয়া গ্রামগুলো যেন এক শান্ত, স্থির অতীত। কিন্তু এই ট্রলারের ওপর তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন জগৎ—গতির জগৎ, ক্ষয়ের জগৎ। এই জগৎ বাইরের পৃথিবীর নিয়ম মানে না। এখানে নীতিশাস্ত্রের চেয়ে ক্ষুধা বড়, সম্মানের চেয়ে বেঁচে থাকা জরুরি। আর বেঁচে থাকার এই সংজ্ঞাও এখানে বড় অদ্ভুত; এখানে নিঃশ্বাস নেওয়াটাই বেঁচে থাকা নয়, বেঁচে থাকা মানে মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকা যে, জীবনটা আসলে কতটা মরে গেছে।

আমি, একজন শহুরে লোক, এই জগতের অংশ নই। ভাওয়াল মির্জাপুর ঘাট থেকে টাঙ্গাইলের মহেড়া জমিদার বাড়ির দিকে আমার যাত্রা। চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টার জলপথ। এই দীর্ঘ সময়টাতেই যে এক বাস্তব চলচ্চিত্র তৈরি হতে থাকবে, তার আঁচ আমি পাচ্ছিলাম। আমার চোখ জমিদার বাড়ির ইটের কারুকার্যের চেয়ে বেশি আটকে গেছে এই ভাসমান জীবনগুলোর দিকে। শত শত গার্মেন্টসের কর্মী, এক সপ্তাহের হাড়ভাঙা খাটুনির পর মুক্তির স্বাদ নিতে ভাড়া করেছে এই জলদানব। তাদের উল্লাস, চিৎকার আর গানের তালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে জীবনের সব ক্লান্তি, হতাশা আর অভাব। কিন্তু এ কি মুক্তি, নাকি মুক্তির নামে আরেক খাঁচায় স্বেচ্ছাবন্দিত্ব? যে মেশিন তাদের শরীরকে নিংড়ে নেয় সপ্তাহের ছয় দিন, সেই ক্লান্তি ভুলতে তারা আজ এমন এক ব্যবস্থার ভোক্তা, যা অন্য কিছু মানুষের শরীর আর আত্মাকে নিংড়ে নিচ্ছে। শোষিত এখানে এসে মুহূর্তের জন্য শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়—এটাই এই সিস্টেমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আমাদের ট্রলারকে পাশ কাটিয়ে গেল আরেকটি ট্রলার। প্রায় সত্তর-আশিজন তরুণের ভিড়। তাদের মাঝে বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝলসে উঠছে পাঁচ-ছয়টি মেয়েলি শরীর। তারা ‘ড্যান্সার’। পরনে সস্তা কিন্তু চটকদার পোশাক। কোমর আর বুক উন্মুক্ত করে তারা নাচছে, আর সেই নাচের তালে তালে তরুণদের চোখে জ্বলছে আদিম ক্ষুধা। এ ক্ষুধা শুধু লালসার নয়, এ ক্ষুধা ক্ষমতার। যে জীবনে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে কয়েকটা টাকার বিনিময়ে আরেকটি শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার এক পাশবিক আনন্দ।

আমার দৃষ্টি আটকে গেল একটি মেয়ের দিকে। নাম ধরে নিলাম, লাবণী। বয়স হয়তো উনিশ কি বিশ। ছিপছিপে গড়ন, মায়াকাড়া মুখ। কিন্তু সেই মুখে হাসির চেয়ে বেশি মিশে আছে এক ধরনের যান্ত্রিক ক্লান্তি। তার হাসিটা পেশাদার, মাপা। যেন কোনো কারখানায় নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। সে শরীর দোলাচ্ছে, কারণ প্রতিটি দোলানির বিনিময়ে তার দিকে উড়ে আসছে দশ, বিশ, পঞ্চাশ টাকার নোট। এই টাকাগুলো শুধু কাগজ নয়, এগুলো তার শ্রমের স্বীকৃতি, তার অপমানের পারিশ্রমিক। ছেলেরা তাকে ঘিরে ধরেছে। কেউ তার কোমরে হাত রাখছে, কেউ কাঁধে। লাবণী নিপুণ দক্ষতায় নিজেকে বাঁচিয়ে, আবার তাদের মনোরঞ্জন করে চলেছে। তার শরীরটা যেন একটা পণ্য, যার ক্রেতা এই উচ্ছৃঙ্খল জনতা। কিন্তু তার আত্মা? সেটিকে সে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে? হয়তো এই কোলাহলের আড়ালে, নিজের গভীরে, যেখানে কারও হাত পৌঁছায় না।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন। বয়স ত্রিশের কোঠায়। শরীরে মেদ জমেছে, মুখের লাবণ্য সময়ের সাথে ক্ষয়ে গেছে। তার নাম হয়তো শিল্পী। সেও একসময় লাবণীর মতো এই আসরের মধ্যমণি ছিল। আজ তার দিকে কেউ তেমন তাকাচ্ছে না। তার চোখে লাবণীর জন্য স্পষ্ট হিংসা নেই, আছে এক গভীর ও বিষণ্ণ বোঝাপড়া। সে লাবণীর মধ্যে নিজের অতীতকে দেখছে, আর নিজের মধ্যে লাবণীর ভবিষ্যৎকে। সে জানে, এই জগতে যৌবনই একমাত্র মুদ্রা, যা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

এই ভাসমান রাজ্যের রানী বসে আছে ট্রলারের এক কোণায়। বয়স চল্লিশের বেশি। আমরা তাকে ‘খালা’ বলে ডাকতে শুনলাম। তার হাতে মোটা সোনার চুড়ি, গলায় চেইন। তীক্ষ্ণ চোখে সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। তার নাম রেহানা। এই মেয়েগুলোর ‘সরদারনি’ সে-ই। এই রাজ্যের আইন সে নিজে বানায়নি, শুধু এই আইনের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড় সে। কোনো ছেলে কোনো মেয়ের সাথে বাড়াবাড়ি করলেই তার চোখ থেকে আগুন ঝরে। তবে সেটা মেয়েটির সম্মান বাঁচানোর জন্য নয়, তার ‘সম্পত্তি’ রক্ষার জন্য। একটি মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা আঘাত পেলে তার লোকসান। খালার ফোনটা এক মুহূর্তের জন্যও নীরব থাকছে না। অন্য ট্রলারে থাকা মেয়েদের খোঁজখবর, পেমেন্টের দর কষাকষি, সবকিছুতেই তার কর্কশ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। বিশ্রী গালিগালাজ তার মুখের বুলি নয়, তার ক্ষমতার অস্ত্র। “ওই হারামজাদা, পুরা টেকা না দিলে মাইয়ারে নামাই আনুম,” ফোনে কাউকে ধমকাচ্ছিল সে।

লাবণী নাচতে নাচতে হাঁপিয়ে গেছে। এক যুবক তার হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু বলল। লাবণীর যান্ত্রিক হাসিটা মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। তার চোখে খেলে গেল এক সেকেন্ডের এক পলক—বিরক্তি, ভয়, নাকি আত্মসমর্পণ? সে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। ছেলেটি নাছোড়বান্দা। খালার দিকে ইশারা করল। খালা চোখের ইশারায় কী যেন বলল, একটা শীতল, নিস্পৃহ অনুমতি। লাবণী ছেলেটির হাত ধরে ট্রলারের নিচের দিকে চলে গেল। সেখানে ছোট ছোট কেবিনের মতো অন্ধকার ঘর। বাইরে তখনো গান বাজছে, উল্লাস চলছে, কিন্তু ওই অন্ধকারের ভেতরে যে বিনিময় হচ্ছে, তা শুধু শরীরের নয়, আত্মারও। এক টুকরো জীবনের বিনিময়ে কিছু কাগজের নোট। এই লেনদেনের কথা ভাবতেই আমার ভেতরটা গুলিয়ে উঠল।

সুযোগ বুঝে আমি শিল্পীর পাশে গিয়ে বসলাম। প্রথমে সে পাত্তা দিল না। একটা বিড়ি ধরিয়ে উদাস চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। নদীর জলে ভাসমান কচুরিপানার মতো তাদের জীবন, কোনো শেকড় নেই, শুধু স্রোতের টানে ভেসে চলা। আমি তার হাতে এক বোতল জল আর একটা চিপসের প্যাকেট দিলাম। সে একবার আমার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে জলটা নিল। এই ছোট উপহারটুকু হয়তো তার কাছে করুণা নয়, বরং এক মুহূর্তের মানবিক স্বীকৃতি।

“আপনাদের এই জীবনটা খুব কঠিন, তাই না?” আমার শহুরে, সরল প্রশ্নটা তার কাছে হয়তো হাস্যকর শোনাল।

শিল্পী ধোঁয়ার সাথে যেন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। “কঠিন-সোজা দিয়া কী অইব? পেট তো চলে। মাসে ষাট-সত্তর হাজার ট্যাকা কামাই। গার্মেন্টসে কাম করলে পাইতাম বিশ হাজার। ওই টাকায় কি আর পোলাপান চলে?” তার দর্শনটা পরিষ্কার: সম্মান একটা বিলাসিতা, যা কেবল ভরা পেটে মানায়। সে আরও জানাল, এরা অনেকেই বাসা থেকে দিনের পর দিন বাইরে থাকে। এই ট্রলারই তাদের ঘর, এই নদীই তাদের জীবন। বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে আসে। কেউ বলে বান্ধবীর বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে, কেউ বলে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি কাজে যাচ্ছে। এই মিথ্যাগুলো তাদের বর্ম। এই বর্ম পরেই তারা সমাজের চোখে ‘ভালো’ থেকে এই ‘খারাপ’ কাজটা করে যায়।

এরই মধ্যে আমার চোখে পড়ল আরেকজনকে। নাম শেফালি। বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ। স্বামীর সংসার আছে। সে জড়সড় হয়ে একপাশে বসে ছিল। আমি তার সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলাম।
“আপনি সচরাচর আসেন না, তাই না?”
মেয়েটি চমকে আমার দিকে তাকাল। তারপর ম্লান হেসে বলল, “না ভাই। আমারে দেইখা বুঝছেন কেমনে?”
“আপনার মধ্যে এখনও সংকোচ আছে,” আমি বললাম। “আপনার শরীর নাচছে, কিন্তু আত্মা এখনো আড়াল খুঁজছে।”
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কানের পাশ থেকে চুল সরাল। তার দুই কানে দুটো করে মোট চারটি ফুটো। খালি, বিবর্ণ। “স্বামীর লগে রাগারাগি কইরা বাপের বাড়ি চইলা আইছিলাম। অহন ফির‍্যা যাইতে চাই। কিন্তু খালি হাতে ফিরলে তো সম্মান থাকব না। তাই চারটা স্বর্ণের কানের দুল বানাইতে দিছি। সেই দুলের টেকা জোগাড় করতেই এইখানে আসা। দুলগুলা কানে দিয়া যখন শাশুড়ির সামনে গিয়া খাড়ামু, তখন আর কেউ খোঁটা দিতে পারব না।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সামাজিকতার কি বিচিত্র দর্শন! যে সম্মান সে স্বামীর ঘরে হারিয়েছে, তা ফিরে পেতে সে এমন এক পথে নেমেছে যেখানে তথাকথিত সমাজের চোখে সম্মানের লেশমাত্র নেই। অপবিত্র টাকায় কেনা পবিত্রতার প্রতীক পরে সে আবার ‘সতীসাধ্বী’ স্ত্রী হিসেবে সংসারে ফিরবে। এই বিরোধাভাস, এই আত্মপ্রবঞ্চনা—এটাই হয়তো তার টিকে থাকার একমাত্র উপায়।

হঠাৎ ট্রলারের নিচের তলার এক কোণ থেকে চাপা কান্নার শব্দে আমার মনোযোগ সেদিকে গেল। আমাদের সাথেই ভ্রমণরত এক যুবক। নাম সজীব। সে চুপচাপ বসে আছে, তার ফোনে খবর এসেছে তার বড় আম্মা মারা গেছেন। তার আনন্দ মাটি হয়ে গেছে। এই বংশাল নদীর উপর থেকে তার যাওয়ার কোনো উপায় নেই, আবার এই উদ্দাম আনন্দের সাথে সে নিজেকে মেলাতেও পারছে না। আনন্দের নৌকায় সে এখন এক শোকসন্তপ্ত বন্দি। তার নীরব কান্না আর ট্রলারের দানবীয় সংগীত—দুটি মিলে এক পরাবাস্তব দৃশ্য তৈরি করেছে। এখানে ব্যক্তিগত শোকের কোনো স্থান নেই; সমষ্টির আনন্দই একমাত্র সত্য।

একটু পর লাবণী কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। তার চুলগুলো এলোমেলো, মুখের হাসিটা পুরোপুরি উধাও। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে সে আবার নাচের বৃত্তে ফিরে গেল। যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার চোখে শূন্যতা। এই শূন্যতা কোনো আবেগের অনুপস্থিতি নয়, বরং সব আবেগ সইতে সইতে তৈরি হওয়া এক গভীর ক্ষত। এই শূন্যতাই এই জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ, আবার সবচেয়ে বড় বর্ম।

হঠাৎ ট্রলারের অন্য প্রান্তে একটা গোলমাল শুরু হলো। একটি মেয়ে, নাম রিণা, মাটিতে বসে কাতরাচ্ছে। তার পাশে আরেকটা মেয়ে মাথায় জল দিচ্ছে। রিণা পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই অবস্থায় সে ছেলেদের সাথে তাল মিলিয়ে নাচছিল। শরীর আর সায় দেয়নি।

খালা ছুটে এল। “কী অইছে? নাটক করস? ওঠ!” তার গলায় কোনো সহানুভূতি নেই, আছে নির্ভেজাল ব্যবসায়িক বিরক্তি।
“খালা, ওর পেটে খুব ব্যথা,” পাশের মেয়েটি বলল।
“ব্যথা করলে কি আমি ডাক্তার? এই দিকে আয়। তেল পইড়া দেই।” খালা রিণার হাত ধরে প্রায় টেনেহিঁচড়ে একপাশে নিয়ে গেল। তার কাছে রিণার জীবন বা তার গর্ভের সন্তানের চেয়ে আজকের দিনের কামাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রিণা তার কাছে একজন কর্মী, একটি ‘প্রোডাকশন ইউনিট’, যা এখন বিকল হয়ে গেছে। এই উন্মত্ত আনন্দের হাটে একটি অনাগত প্রাণের আর্তনাদ চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই শিশুটি যদি জন্মায়ও, কোন পৃথিবীতে সে চোখ মেলবে? এই ট্রলারের ভাসমান নরকে? তার মা’র পরিচয় কী হবে? ‘ট্রলারের মাইয়া’?

রিণার এই অবস্থা দেখেও নাচ-গান থামল না। বরং চাহিদা মেটাতে লাবণীর ওপর চাপ বাড়ল। সে আবার নাচতে শুরু করেছে। তার প্রতিটি মুদ্রা, প্রতিটি শরীরী ভাঁজে ফুটে উঠছে এক তীব্র প্রতিবাদ আর অসহায় আত্মসমর্পণ। সে কি নাচছে, নাকি তার শরীরটা এক অদৃশ্য সুতোর টানে নাচছে?

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। বংশাল নদীর জল সূর্যের শেষ আলোয় সোনার মতো চিকচিক করছে। কি অদ্ভুত প্রতারণা প্রকৃতির! এত কলঙ্ক, এত কান্না, এত শোষণকে ধারণ করেও নদীর জল কী নির্বিকারভাবে সুন্দর। জমিদার বাড়ি দেখা আমার কাছে গৌণ হয়ে গেছে। আমি এক জীবন্ত উপন্যাসের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম, যার প্রতিটি অক্ষরে লেখা আছে সমসাময়িক সমাজের ব্যর্থতার ইতিহাস।

ট্রলারগুলো ঘাটের দিকে ফিরতে শুরু করেছে। মেয়েগুলোর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। তাদের সারাদিনের উপার্জন খালার হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। খালা একটা নোটবুকে কীসব হিসেব করছে। লাবণী পেয়েছে আঠারোশ টাকা, শিল্পী বারোশ। শেফালি তার টাকাগুলো হাতে নিয়ে সাবধানে গুনছে, তার চোখে কানের দুলের স্বপ্ন চিকচিক করছে। খালা প্রত্যেকের থেকে তিন-চার হাজার টাকা চুক্তি করে নিলেও তাদের হাতে দিচ্ছে সামান্যই। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। কারণ এই পৃথিবীতে খালাই তাদের অন্নদাতা, আবার শোষকও।

রিণাকে নিয়ে একটা ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হলো। शायद কোনো স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাবে। খালা তার সাথে গেল না, শুধু কিছু টাকা দিয়ে দিল। তার কাছে রিণা এখন একটা বাতিল মাল।

ট্রলার ঘাটে ভিড়ল। কোলাহল থেমে গেল। যে তরুণরা কিছুক্ষণ আগেও উদ্দাম নাচে মত্ত ছিল, তারা এখন শান্ত, পরিশ্রান্ত। তারা ফিরে যাবে তাদের ঘিঞ্জি মেসে, কাল সকাল থেকে আবার সেই মেশিনের সাথে লড়াই। এই একদিনের ‘মুক্তি’ তাদের জন্য এক ধরনের নেশা, যা তাদের বাকি ছয়দিনের যন্ত্রণা ভুলিয়ে রাখে।

মেয়েরাও যার যার মতো অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি লাবণীর পিছু নিলাম। সে একটা ছোট টেম্পোতে উঠে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কালকে আবার আসবেন?”

লাবণী আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী। তার চোখে কোনো প্রশ্ন ছিল না, ছিল একরাশ ক্লান্তি আর বাস্তবতা। সে ফিসফিস করে বলল, “ফিরা যাইতে চাই। গার্মেন্টসে… সৎ পথে…”

তার কথা শেষ হলো না। কিন্তু আমি তার চোখের ভাষা পড়তে পারলাম। সেখানে লেখা ছিল এক গভীর সংশয়। সে কি সত্যিই ফিরতে চায়? নাকি এটা শুধু নিজেকে দেওয়া সান্ত্বনা? মাসে সত্তর হাজার টাকার হাতছানি কি তাকে বিশ হাজারের ‘সৎ’ জীবনে ফিরতে দেবে? এই জগৎটা একটা চোরাবালির মতো। একবার পা দিলে শরীর ও মন দুটোই এর নোনা জলে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফেরাটা তখন আর নিজের ইচ্ছের ওপর থাকে না।

টেম্পোটা চলতে শুরু করল। অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে আমি লাবণীর মুখটা শেষবারের মতো দেখলাম। সেই মুখে কোনো স্বপ্ন ছিল না, ছিল শুধু বেঁচে থাকার এক নির্মম সংকল্প।

আমি ঘাটে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা। কিন্তু আমার কানের ভেতরে তখনো বাজছে সেই কান ফাটানো গান, চোখে ভাসছে লাবণীর যান্ত্রিক নাচ, আর বুকের ভেতর অনুভব করছি রিণার অনাগত সন্তানের নীরব কান্না আর সজীবের চাপা শোক। এই নীরবতা গানের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।

আমি মহেড়া জমিদার বাড়ি দেখতে এসেছিলাম, যা ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু আমি দেখে গেলাম বর্তমানের এক নিষ্ঠুরতম অধ্যায়। এই মেয়েরা কোনো জমিদার বাড়ির রাজকুমারী নয়, তারা এই নোনা জলের ট্রলারের বন্দিনী। তাদের জীবন কোনো ইতিহাস বইয়ে লেখা থাকবে না। তাদের গল্পগুলো বংশাল নদীর ঢেউয়ের সাথে মিলিয়ে যাবে, তাদের দীর্ঘশ্বাস মিশে যাবে ডিজেলের ধোঁয়ায়। এই নতুন পৃথিবী, যা আমি আজ দেখলাম, তা কোনো কল্পনার জগৎ নয়। এটা আমাদের সমাজেরই এক লুকানো বাস্তবতা, এক অলিখিত দর্শন। এই গল্প হয়তো বিশ্ববিখ্যাত হবে না, কিন্তু এই গল্পগুলোই প্রতিদিন লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা নদীগুলোর বুকে। এই গল্প ‘ট্রলারের মাইয়া’দের গল্প, যাদের কান্না শোনার মতো কেউ নেই।

Facebook
LinkedIn

2 thoughts on “ট্রলারের মাইয়া – সুমন নাসির”

  1. গল্পটা বাস্তবতার সাথে খুবই মিল রয়েছে ।গল্প হতেও সত্যি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

“আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে… মহুয়া আমি নিজেই।”

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা……

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে……

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top