মহানন্দার তীরে

বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়

বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়

– একটি গল্প

বিকেলটা তখনো থেমে থেমে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে আছে। আকাশে গাঢ় ধূসর মেঘ, রাস্তার দু’ধারে কচি পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটা। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। এমন সময়, শহরের ব্যস্ততার ওপারে, নদীর পাড়ের ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে আছে আরিব।

আজ আরিবের মনটা অন্যদিনের মতো নয়। সারাদিন ধরে এক ধরনের অস্থিরতা তাকে ঘিরে রেখেছে। সে জানে না কেন—হয়তো কোনো অচেনা টান, কিংবা কোনো অদৃশ্য প্রত্যাশা। বৃষ্টি থেমে গেলে বাড়ি ফিরবে ব্যাগ কাঁধে—এমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু যেন কোথাও এক অদৃশ্য ডাক তাকে থামিয়ে দিল।

ঠিক তখনই, চকচকে লাল ছাতা মাথায় নিয়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল এক মেয়ে। ভিজে চুল কাঁধ ছুঁয়ে পড়ছে, চোখে হালকা অস্বস্তি—তবে মুখে এক শান্ত সৌন্দর্য। মেয়েটির নাম তাসনীম, আরিব জানে না এখনও। শুধু চোখের সেই প্রান্তিক দৃষ্টি মনে হলো—কোথাও যেন আগে দেখা।

চায়ের দোকানের মালিক বলল,
—আপা, ভিজেছেন দেখছি! বসেন, গরম চা দিচ্ছি।

তাসনীম হালকা হাসল। সেই হাসি অদ্ভুতভাবে আরিবের বুকের ভেতর ঢেউ তুলল।
আরিব তাকিয়ে থাকলো, আবার চোখ ফেরাল—যেন ধরাও পড়ে যায় না।

মেয়েটি পাশের টেবিলটায় বসল। ছাতাটা গুটিয়ে রাখতেই ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। আরিব অগোচরে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাসনীমও একসময় আরিবের দৃষ্টি টের পেল। চোখে চোখ পড়তেই দু’জনেই একটু হেসে নিল—কথা না হয়েও এক ধরনের কথোপকথন হয়ে গেল।

একসময় বৃষ্টি আরও জোরে নামল। দোকানের টিনের চালে টুপটুপ শব্দে এক ধরনের সুর তৈরি হলো।

তাসনীম হালকা উত্তেজিত স্বরে বলল,
—এমন বৃষ্টি… আমার ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয় সব ধুয়ে-মুছে নতুন হয়ে যায়।

আরিব ধীর কণ্ঠে বলল,
—হ্যাঁ, আজকের সন্ধ্যাটাও যেন একটু অন্য রকম।

দু’জনের কথা জড়িয়ে যেতে লাগল—চা, বৃষ্টি, জীবন—সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেল তারা। তাসনীম বলল তার গল্প—কেন যেন একাকিত্ব বারবার তাকে ছুঁয়ে যায়। আরিবও খুলে বলল মনের জমে থাকা কথা—চাইলে কেউ কি সত্যিই কারও কথা শোনে?

চায়ের দোকানের টিনের ওপর বৃষ্টি তালা লয়ের মতো বাজছে। আরিব হঠাৎ মনে মনে উপলব্ধি করল—এতদিনের অপেক্ষা যেন আজ পূর্ণ হলো। তাসনীমের চোখেও এক ধরনের শান্তির ছাপ।

বৃষ্টি একটু কমতেই তাসনীম ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠল।
—আমি যাই, দেরি হয়ে যাবে।

আরিব থেমে গেল, কিছু বলতে চাইলো—কিন্তু শব্দ খুঁজে পেল না।
তাসনীম একটু পাশে এগিয়েই থামল।
হেসে বলল,
—চাইলে… আবার কখনো দেখা হতে পারে।

এই এক বাক্যে যেন আরিবের ভেতর একটি নতুন দরজা খুলে গেল।

তাসনীম লাল ছাতা খুলে বৃষ্টির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
আরিব তাকিয়ে রইল—মেঘলা আকাশ, ভেজা রাস্তা আর সেই অদ্ভুত সন্ধ্যার দিকে।

আজকের এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা শুধু বৃষ্টি নয়—
এটি হয়ে গেল এক নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি।

Facebook
LinkedIn

2 thoughts on “বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার করুন :

আরও পোস্ট

মহুয়ার মাতাল চোখ – সুমন নাসির

“আমি জানি—আমি ফিরে এসেছি ঠিকই। কিন্তু যে অংশটা ফিরে আসেনি, সেটা এখনও পদ্মার চরে ভাসছে। আর সত্যটা এখন আমার ভেতরে ধীরে ধীরে উঠে আসছে… মহুয়া আমি নিজেই।”

নীল ধুতুরা – সুমন নাসির

মেয়েটির গায়ে অজানা এক বনজ সুবাস, পাশে এসে দাড়ালেই বাতাসে ভাসে অজানা ফুলের মায়াবী মাদকতা। হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের মতো ইথারে নাচানাচি করে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ফুলের ঘ্রাণ ও রেণু। রক্তের নিউরণে নিউরণে সৃষ্টি হয় আড়োলন, মস্তিষ্ক খুঁজতে থাকে মেয়েটির দেহে, নিঃশ্বাসে অজানা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ। মাথাটা ঝিমঝিম করে তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের উঠানামায়। হৃদয় তোলপাড় করা সেই ঘ্রানের সাথে মেলেনা গোলাপ, বেলী, বকুল, হাসনাহেনা কিংবা রজনীগন্ধা।

বাথান – সুমন নাসির

তাদের আবেগ ছিল বরেন্দ্রের তপ্ত মাটির মতোই জ্বলন্ত। রফিকের ঘাম-মাখা পুরুষালি গন্ধ আর চম্পার কাঁচা হলুদের মতো সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল—যেন সমাজ, শ্রেণি, সব তুচ্ছ। সেই মিলন শুধু শরীরের ছিল না। ছিল দুটো আত্মার তীব্র আর্তি—সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার মরিয়া চেষ্টা……

লাল মাটির মায়া – সুমন নাসির  

সাঁওতাল মাঝির একমাত্র মেয়ে। তার গায়ের রঙ যেন এই বরেন্দ্রের লাল মাটি দিয়েই গড়া—গভীর তামাটে, যাতে সূর্যের আলো পড়লে সোনালি আভা খেলে। ঘন কালো চুল খোঁপায় বাঁধা, তাতে গোঁজা বুনো ফুলের মালা, যার গন্ধে চারপাশ মাতাল হয়ে যায়। নীল শাড়ি খাটো করে জড়ানো কোমরে, হাতে-গলায় রুপোর গয়না ঝলমল করছে……

আমাদের একটি বার্তা পাঠান

সম্পর্কিত পোস্ট

Scroll to Top