মহানন্দার তীরে

মুখোশের আড়ালে – সুমন নাসির

শহরটা দেখতে বড় চকচকে, বাইরে থেকে মনে হয় যেন সবকিছু সোনায় মোড়া। সন্ধ্যাবেলায় কাঁচের দালানকোঠাগুলোতে রোদ পড়লে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, পুরো জায়গাটা যেন হীরের টুকরোয় গড়া। নিওন লাইটের ঝলকানি, ফেসবুকের টাইমলাইনে সবাই যেন সুখের ছবি তুলে পোস্ট করে—হাসি, আলিঙ্গন, আর ক্যাপশন “#Blessed”। নিরব আর মেহরিন ছিলেন সেই সুখের একটা জ্বলজ্বলে উদাহরণ। নিরব দেখতে সুদর্শন, চাকরিতে ভালো পজিশন, মেহরিন স্মার্ট, বুদ্ধিমতী মেয়ে। দুজনেরই ডিসেন্ট জব, উইকেন্ডে ফ্যান্সি রেস্তোরাঁয় ডিনার, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেখে লোকে দীর্ঘশ্বাস ফেলত—আহা, জীবন তো এদের মতো হওয়া উচিত!

কিন্তু জানো তো, সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর দাগ। জীবনটা সবসময় ফিল্টার লাগানো ছবির মতো হয় না।

নিরব ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। প্রথমে ছোটখাটো জিনিস—বাড়ি ফিরতে একটু দেরি, ফোনটা সবসময় উল্টো করে রাখা, যেন কিছু লুকোচ্ছে। মেহরিন লক্ষ্য করল, নিরব আর আগের মতো তার চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। সম্পর্কটা যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে, ঘরভর্তি লোকের মধ্যেও একটা অদ্ভুত শূন্যতা, যেন শীতের কনকনে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।

প্রমাণটা এল একটা বৃষ্টির রাতে। নিরব তখন গভীর ঘুমে। তার ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ ফ্ল্যাশ করল—তৃষা। অফিসের নতুন প্রজেক্ট ম্যানেজার। মেসেজটা ছোট, কিন্তু বিষাক্ত: “কাল আসছ তো? তোমাকে ছাড়া দম বন্ধ হয়ে যায়।” মেহরিনের হৃদয়টা যেন থমকে গেল। সে চিৎকার করল না, কাঁদল না বালিশে মুখ গুঁজে। শুধু অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে রইল। সে জানত, পরকীয়া কোনো আকস্মিক ভুল নয়; এটা ইচ্ছাকৃত বিশ্বাসঘাতকতা। আর বিশ্বাসঘাতকতার উত্তর কান্না দিয়ে হয় না, হয় পরিকল্পনা দিয়ে।

তাই শুরু হল মেহরিনের খেলা। কিন্তু সেটা ছিল এমন একটা খেলা, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

সে নিরবকে বুঝতে দিল না যে সে সব জেনে গেছে। উল্টে, আরও বেশি যত্ন করে উঠল তার। রাতের খাবারটা স্পেশাল করে বানাত, হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করত দিনটা কেমন গেল। এই সুযোগে সে নিরবের ল্যাপটপ আর গুগল ড্রাইভের অ্যাক্সেস নিয়ে নিল। যা পেল, তা শুধু একটা পরকীয়ার গল্প ছিল না—ছিল একটা বড়সড় অপরাধের জাল। নিরব আর তৃষা মিলে কোম্পানির কয়েক কোটি টাকা পাচার করছিল। ভুয়া ইনভয়েস, সাইড ডিল—তারা ভেবেছিল তারা খুব চালাক। কিন্তু তারা জানত না, মেহরিন আসলে কতটা শার্প।

অফিসের সেই দিনটা ছিল নাটকীয়। নিরব যখন অডিটোরিয়ামে ঢুকল, দেখল মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে। তার চোখ বড় হয়ে গেল, পায়ের তলায় মাটি যেন সরে যাচ্ছে। বড় স্ক্রিনে ভেসে উঠল সবকিছু—গোপন চ্যাট, ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন, ভুয়া ডকুমেন্ট। নিরবের সম্মান, ক্যারিয়ার, সবকিছু যেন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল। লোকে ফিসফিস করতে লাগল, পুলিশ এল, হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে গেল।

কিন্তু গল্পের আসল টুইস্ট তখনও বাকি।

কয়েক মাস পরে। নিরব তখন জেলে, তার জীবনটা ছিন্নভিন্ন। তৃষার কোনো খোঁজ নেই, যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মেহরিন শহর ছেড়ে দূরের একটা পাহাড়ি বাংলোয় চলে গেছে। বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছে, ল্যাপটপে একটা পুরনো ইমেল ড্রাফট খোলা।

প্রথম সারপ্রাইজ: তৃষা আসলে কোনো র্যান্ডম সহকর্মী ছিল না। সে ছিল মেহরিনের ছোটবেলার পরিচিত, একটা দূরের বোনের মতো। তার পরিবারকে একসময় নিরব তার পজিশনের অপব্যবহার করে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। মেহরিন আর তৃষা মিলে এই পুরো ফাঁদটা পেতেছিল। তৃষা নিরবকে প্রেমে ফেলেনি, বরং লোভের নেশায় বুঁদ করে রেখেছিল, যাতে সে বড় কোনো ভুল করে বসে—যেমন কোম্পানির টাকা পাচার।

আর চূড়ান্ত টুইস্ট: সেই নিখোঁজ টাকাগুলো আসলে কোথায় গেল? পুলিশ বা কোম্পানি কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি। সবাই ভেবেছিল নিরব কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, মেহরিন অডিটের সময় এমন একটা ডিজিটাল ট্রিক ব্যবহার করেছিল যে, টাকাগুলো কয়েকটা ভুয়া চ্যারিটি অর্গানাইজেশনের মধ্য দিয়ে ঘুরে সোজা তার নিজের অফশোর অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। কেউ কিছু বুঝতেই পারেনি।

নিরব ভেবেছিল সে মেহরিনকে ধোঁকা দিচ্ছে। 
তৃষা ভেবেছিল সে মেহরিনকে হেল্প করছে। 
কোম্পানি ভেবেছিল তারা চোর ধরেছে। 

কিন্তু আসলে পুরো দাবার বোর্ডটা ছিল মেহরিনের হাতে। সে শুধু তার বিশ্বাসঘাতক স্বামীর প্রতিশোধ নেয়নি, নিজের ভবিষ্যৎটাও সিকিওর করে নিয়েছে—একদম পারফেক্টলি।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেহরিন নিজেকে একবার দেখল। চোখে কোনো পছন্দতাপ নেই, শুধু একটা শান্ত দৃঢ়তা। এই শহরে পাপ মানে শুধু পরকীয়া নয়, পাপ মানে কাউকে দুর্বল ভেবে নেওয়া। মেহরিন দুর্বল ছিল না; সে ছিল সবচেয়ে স্মার্ট প্লেয়ার। যে ঝড়ে নিরব উড়ে গেছে, সেই ঝড়ের নাম ছিল মেহরিন।

Scroll to Top